খুলনা মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ডে থমকে গেছে শতাধিক অপারেশন

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বন্ধ হয়ে গেছে জরুরি অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা। এতে শতাধিক রোগীর অস্ত্রোপচার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার ভোর ৬টার দিকে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে ইমার্জেন্সি অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অক্সিজেন লাইন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে জরুরি ও সাধারণ অস্ত্রোপচার কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে।

দুই মাসের বেশি সময় ধরে ঘাড়ের জটিল অপারেশনের অপেক্ষায় ছিলেন জালাল হোসেন নামে এক রোগী। বুধবার সকালে তাঁর অপারেশন হওয়ার কথা থাকলেও অগ্নিকাণ্ডের কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। এখন নতুন করে কবে অপারেশন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি ও তাঁর পরিবার।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিউরোসার্জারি বিভাগে অপারেশনের অপেক্ষায় অন্তত ৩৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ জন তিন মাস ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন।

নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রিয়াজ আহমেদ হাওলাদার বলেন, গতকাল অপারেশন করা সম্ভব হয়নি। অন্তত ১০ জন রোগী অপারেশনের অপেক্ষায় ছিলেন। বাকিদেরও পরবর্তী সপ্তাহে করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এখন নতুন করে সিরিয়াল দিতে হবে। সামনে ঈদের ছুটি থাকায় রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।

হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের তৃতীয় তলার ৯-১০ ও ১১-১২ নম্বর ওয়ার্ডে গত দুই দিনে প্রায় ৫০টি অপারেশন বাতিল হয়েছে। প্রতিদিন যেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০টির বেশি অপারেশন হয়, সেখানে বৃহস্পতিবার মাত্র দুটি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়েছে।

সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. কনক হোসেন বলেন, পোস্ট অপারেটিভ বেড না থাকায় রোগীদের নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা নেই। তাই অপারেশন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ রয়েছে। জরুরি কিছু রোগীকে সদর হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

এ ছাড়া ইউরোলজি, গাইনি, শিশু সার্জারি, নাক-কান-গলা ও চক্ষু বিভাগ মিলিয়ে বুধ ও বৃহস্পতিবার শতাধিক রোগীর অপারেশন হওয়ার কথা থাকলেও সব মিলিয়ে মাত্র ছয়টি অপারেশন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে অন্তত পাঁচজন আহত হন। আহতদের মধ্যে হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, নার্স দিপালী ও শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুই নার্স আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে। এছাড়া আইসিইউ থেকে সরানোর সময় নাসরিন নাহার নামে এক নারী রোগীর মৃত্যু হয়।

ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেদনে কাউকে দায়ী না করে ঘটনাটিকে “দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মোঃ আইনুল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল ভবনটি প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো। শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করছি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সোনাডাঙ্গা মডেল থানা-র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আংশিকভাবে ভেঙে পড়ায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ঈদের আগে অপারেশন সম্পন্ন করে বাড়ি ফেরার আশা করা রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।