হারিয়ে যাচ্ছে দেশি খেজুরের কদর, আগ্রহ নেই নতুন প্রজন্মের

খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এখনও দেখা যায় সারি সারি দেশি খেজুরগাছ। রাস্তার পাশে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা পতিত জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এসব গাছে মৌসুম এলেই থোকায় থোকায় ধরে খেজুর। কিন্তু একসময় মানুষের প্রিয় এই দেশি ফল এখন আর আগের মতো কদর পাচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ খেজুর গাছেই পেকে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও মাটিতে ঝরে পড়ে থাকছে, আবার কোথাও পাখিরাই খেয়ে শেষ করছে ফলগুলো।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস। একসময় গ্রামের মানুষ যেসব দেশি ফলের জন্য অপেক্ষা করতেন, এখন সেসব ফলের জায়গা দখল করেছে বিদেশি ফল ও বাজারকেন্দ্রিক খাদ্যসংস্কৃতি। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে দেশি খেজুরের ওপরও।

খুলনার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অসংখ্য খেজুরগাছে ঝুলছে পাকা ফল। কিন্তু সেগুলো সংগ্রহ করতে খুব কম মানুষকেই দেখা যায়। অথচ কয়েক বছর আগেও এই চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, দেশি খেজুর একসময় গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ছিল অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি মৌসুমি ফল। বাজারে বিক্রির জন্য নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক আনন্দের অংশ হিসেবেই এই ফল খাওয়া হতো। শিশু-কিশোররা দল বেঁধে গাছে উঠতো, কেউ লাঠি দিয়ে খেজুর পাড়তো, আবার কেউ লবণ মিশিয়ে কয়েকদিন রেখে পাকিয়ে খেতো।

নগরীর রায়েরমহল এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আনাস বলেন, আগে খেজুর পাকলে পাড়ার ছেলেপেলেরা গাছের নিচে ভিড় করতো। সবাই মিলে খেতাম। এখন আর কেউ আগ্রহ দেখায় না।

আরেক প্রবীণ বাসিন্দা মোতাহার হোসেন জানান,এই খেজুরের স্বাদ ছিল একদম আলাদা। এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেকেই এই ফল চিনেই না। তারা বাজারের ফলেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

বর্তমানে খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খেজুরগাছগুলোতে প্রচুর ফল ধরলেও সেগুলোর বড় অংশই অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। কোথাও গাছের নিচে পড়ে পচে যাচ্ছে, কোথাও পাখির খাদ্যে পরিণত হচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, আগের মতো মানুষ এখন আর গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করতে চায় না। কারণ অনেকেই এসব দেশি ফলকে ‘গ্রামীণ’ বা ‘অপ্রচলিত’ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি বাজারে সহজলভ্য বিদেশি ফলের কারণে দেশি ফলের প্রতি আগ্রহ কমেছে।

একটি বিষয় স্থানীয়দের বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলছে যে ফল কোনো ধরনের রাসায়নিক বা কীটনাশক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।

স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি খেজুরগাছের বড় সুবিধা হলো এতে আলাদা কোনো পরিচর্যা লাগে না। বছরের পর বছর স্বাভাবিকভাবেই গাছে ফল ধরে। কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না বললেই চলে।

তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও বাজারজাতের উদ্যোগ নেওয়া গেলে দেশি খেজুর আবারও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। স্থানীয়ভাবে খেজুর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা বাজারজাতের উদ্যোগ নিলে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দেশি খেজুরের এই অবহেলা শুধু একটি ফলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ঘটনা নয় এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও জীবনধারার পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি। একসময় যে ফলকে ঘিরে তৈরি হতো মৌসুমি আনন্দ, এখন সেটিই নীরবে ঝরে পড়ছে মাটিতে।

স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, নতুন প্রজন্মকে দেশি ফলের সঙ্গে পরিচিত করানো এবং এসব ফলের পুষ্টিগুণ ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে উদ্যোগ প্রয়োজন। নইলে একসময় গ্রামবাংলার পরিচিত দেশি খেজুর শুধু স্মৃতির গল্প হয়েই থেকে যাবে।