শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানালো

বাবার কাঁধে চড়ে স্বপ্ন ছোঁয়ার লড়াই জিন্নাতের

ঝড়-বৃষ্টি কিংবা তীব্র শীতের কুয়াশা কোনো কিছুই দমাতে পারেনি আফিয়া জিন্নাতকে (১৭)| যে মেয়েটি নিজের পায়ে হাঁটার ক্ষমতা নেই, যার হাত দুটোও স্বাভাবিকভাবে লিখতে সায় দেয় না, সেই আফিয়া জিন্নাতই এক বুক স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে অংশ নিয়েছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়|
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ময়মনসিংহের গৌরীপুর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে যখন প্রথম দিনের বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা শুরু হয়, তখন সেখানে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়| বাবার মোটরসাইকেলে চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসা জিন্নাতকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিতে পরম মমতায় নিজের কাঁধে তুলে নেন তার বাবা| বাবার সেই চওড়া কাঁধই যেন জিন্নাতের উড্ডয়নের ডানা হয়ে উঠেছে|
আফিয়া জিন্নাত উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের মো. আব্দুল ওয়াদুদ ও মোছা. মুর্শিদা দম্পতির দুই কন্যার মধ্যে বড় সন্তান| সে এবার গৌরীপুর সরকারি কলেজের মানবিক শাখা থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে| এর আগে খলতবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সাফল্যের সাথে ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করেছিল সে|
পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে যখন আফিয়া জিন্নাত বের হয়ে আসছিল, তখন তার মুখে ছিল এক চিলতে বিজয়ীর হাসি| জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে জিন্নাত বলে, “জীবনের অনেক ইচ্ছে আছে আমার| যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, সেগুলোকে জয় করে আমি জীবনে একটা কিছু করবই, অবশ্যই একটা কিছু করব|”
জিন্নাতের এই কঠিন লড়াইয়ের পেছনে ছায়ার মতো জড়িয়ে আছেন তার মা-বাবা| দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা বাবা আব্দুল ওয়াদুদ মেয়ের ¯^প্নপূরণের সারথি হতে দেশে ফিরে এসেছেন|
তিনি বলেন, “প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত সময়ের ব্যবস্থা করতে আমাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে, অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে| কিন্তু আমি চাই আমার মেয়েটা জীবনের এই যুদ্ধে জয়ী হোক| ওর অদম্য ইচ্ছাশক্তি আমাকে মুগ্ধ করে, নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জোগায়| মেয়েকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি| সবার কাছে আমার মেয়ের জন্য দোয়া চাই|”
মেয়ের প্রতি মায়ের আত্মত্যাগও কম নয়| মা মুর্শিদা বেগম প্রতিদিন ঝড়-বৃষ্টি আর কুয়াশা উপেক্ষা করে হুইল চেয়ারে ঠেলে মেয়েকে বিদ্যালয় ও কলেজে নিয়ে যেতেন| তিনি পরম তৃপ্তিতে বলেন, “আমার মেয়ের পড়াশোনার প্রতি প্রবল ইচ্ছা| ও একদিনের জন্যও কলেজ বা প্রাইভেটে অনুপস্থিত থাকেনি| আমরাও সাধ্যমতো ওর পাশে থেকে স্বপ্নপূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি|”
পরীক্ষা কেন্দ্র কর্তৃপক্ষও জিন্নাতের এই লড়াইকে সহজ করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে| গৌরীপুর মহিলা কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব আবু সিদ্দিক জানান, “নিয়ম অনুযায়ী আমরা এই বিশেষ পরীক্ষার্থীর সুবিধার্থে নিচতলায় আসন বিন্যাস করেছি| এছাড়া শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত অতিরিক্ত সময়ের সুবিধাও তাকে দেওয়া হয়েছে|”
কেন্দ্র পরিদর্শক প্রভাষক কবীরুল আলম ও শাহজাহান সিরাজ জানান, জিন্নাতের দিকে তাদের বিশেষ নজর ছিল এবং সে অত্যন্ত চমৎকার ও সুন্দরভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে|