খুলনার চারটি ওয়ার্ড এখন ডেঙ্গুর ‘রেড জোন’

খুলনা নগরীর চার ওয়ার্ড এখন ডেঙ্গুর ‘রেড জোন’। ২৮, ২৯, ৩০ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এসব এলাকাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে এসব এলাকার মানুষের বাস্তব চিত্র একজনের জ্বর সেরে ওঠার আগেই আক্রান্ত হচ্ছেন পরিবারের আরেক সদস্য।

এরই একটি চিত্র নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডে। ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শাকিল আহমেদের শরীরে চলতি মাসের শুরু থেকেই জ্বর। গত সোমবার পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ভর্তি হন নগরীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। দুদিন পর জ্বর আসে তাঁর ছোট মেয়ের। পরীক্ষায় তারও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এভাবে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই পরিবারের চারজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।

চিকিৎসাধীন শাকিল আহমেদ বলেন, ‘শুধু আমাদের পরিবারই নয়, পাশের এলাকার ঘরে ঘরে মানুষের জ্বর। টুটপাড়ার অনেক গলির প্রায় সবারই ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে।’

শুধু শাকিলের পরিবার নয়, কেসিসির তথ্যও বলছে নগরীতে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। ১৩ আগস্ট পর্যন্ত খুলনার ৩১টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৯৭৫ জন। এর মধ্যে চলতি আগস্টের প্রথম ১৩ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৬২৯ জন। মারা গেছেন দুজন।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ১১১ জন। এরপর ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ১০০ জন, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৮০ জন এবং ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ৭৭ জন। এই চার ওয়ার্ডকেই রেড জোন ঘোষণা করেছে কেসিসি।

শুধু উচ্চ ঝুঁকির চার ওয়ার্ডেই থেমে নেই উদ্বেগ। ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে কমলা জোন বা মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২৬৮ জন। আর ১৫, ২০, ২৫ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডকে হলুদ জোন বা কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ১১৭ জন।

নগরীর ওয়ার্ডগুলোতে আক্রান্ত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালেও বাড়ছে রোগীর চাপ। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৯ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৪৬ জন।

কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মীউল ইসলাম বলেন, খুলনা জেনারেল হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে প্রতিদিন ডেঙ্গু শনাক্তের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়া রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতেই ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকির তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেড জোনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করেছে কেসিসি। বৃহস্পতিবার থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০টি ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রে দিয়ে মশক নিধন করা হচ্ছে। উন্মুক্ত স্থান ও বড় নালায় মশা নিধনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি করে হুইল ব্যারো ফগার মেশিন। এর পাশাপাশি শুধু মশা মারলেই হবে না মশার প্রজননস্থল ধ্বংসেও নজর দিচ্ছে কেসিসি।

শনিবার থেকে ব্যক্তিগত স্থাপনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু হয়েছে। প্রথম দিন ২৮ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের চারটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বাড়ির মালিকদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়।

কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, আক্রান্তের হার বিবেচনায় চারটি ওয়ার্ডকে রেড, পাঁচটি কমলা এবং চারটি হলুদ জোন ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে এসব এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে কেসিসির এই বিশেষ তৎপরতাকে ইতিবাচক বললেও নগরীতে ডেঙ্গুর এমন বিস্তারের কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক নেতারা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)- এর জেলা সভাপতি কুদরত ই খুদা বলেন, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর বিশেষ তৎপরতা শুরু করা ইতিবাচক। তবে উপদ্রব বাড়ল কেন এবং কার গাফিলতিতে ঘরে ঘরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে সেটিও খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কেসিসির পাশাপাশি নগরবাসীকেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মশাবাহিত রোগের নাম নয় খুলনার চার ওয়ার্ডে এটি হয়ে উঠছে পারিবারিক আতঙ্কের নাম। একই ঘরে একজনের জ্বর, তারপর আরেকজন, এরপর একে একে পুরো পরিবার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নগরবাসীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

একদিকে রেড জোনে পরিণত হয়েছে নগরীর চার ওয়ার্ড, অন্যদিকে হাসপাতালের শয্যায় বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। মশা নিধনে ফগার চলছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতও মাঠে নেমেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে একটি পরিবারকে একসঙ্গে ডেঙ্গুর কবল থেকে বাঁচাতে শুধু মশা মারার অভিযানই কি যথেষ্ট, নাকি মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে আরও কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন?

খুলনার চার ওয়ার্ডের বর্তমান চিত্র যেন সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই এখন আর শুধু সিটি করপোরেশনের নয়, প্রতিটি পরিবারেরও।