ধর্ষণ : রেহাই পেলেন না ৭০ বছরের ভিখারিনীও!

ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বেড়ে চলেছে ধর্ষণের ঘটনা। প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে এমন খবর জায়গা করে নেয়। এক বছরের শিশু থেকে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা কামরিপুর বিকৃত প্রকাশ কাউকেই রেহাই দিচ্ছে না। এর সাম্প্রতিকতম ও ন্যক্কারজনক নমুনা দেখা গেল বর্ধমানে। সত্তর বছরের এক প্রবীণ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

ধর্ষক রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে গেছে রাস্তার ধারে। ধর্ষণের আগে ওই নারীকে ‘মা’ সম্বোধন করে চা খেতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল সেই ব্যক্তি। তারপরই এই কাণ্ড। হুগলির শ্যাওড়া গ্রামে বাড়ি নিগৃহীতার। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ভবঘুরের মতো জীবনযাপন করেন তিনি। চেয়েচিন্তে খান। তাকে নিশানা করে দুর্বৃত্ত।

যা কী ঘটেছিল সেদিন

বৃদ্ধার বয়ানে উঠে এসেছে সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা। ঘুরতে ঘুরতে গত শুক্রবার বর্ধমানে এসেছিলেন তিনি। একাই বসেছিলেন রাস্তার ধারে। বৃদ্ধা বলেন, ‘একটা ছেলে এসে আমাকে বলে, ‘মা চা খেতে যাবে? আমি বুড়ি মানুষ, সকালে চা খেলে ভালো লাগবে বলে ওর সঙ্গে গেলাম। তারপর আমাকে একটা নির্জন জায়গায় নিয়ে গেল। আমার উপর অত্যাচার চালায়। মারধরও করে।’

এরপর বৃদ্ধা কোনোরকমে আসেন বড় রাস্তার ধারে। তখন তার শাড়ি রক্তে ভিজে লাল। ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। উৎসুক মানুষ আড়চোখে তাকালেও এগিয়ে আসেনি। তবে ক্রমশ অমানবিক হতে থাকা এই সভ্যতায় সহমর্মিতার সম্পূর্ণ মৃত্যু ঘটেনি। বৃদ্ধা বলেন, ‘চারটি ছেলে আমার কাছে আসে। জানতে চায়, কী হয়েছে। তারপর আমাকে একটি রিকশায় চাপিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসে।’

কিন্তু ওই চার যুবক রক্তাক্ত বৃদ্ধাকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করাননি। বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের খোলা চত্বরে বসিয়ে রেখে চলে যান তারা। ঘটনাচক্রে সেদিন একাধিক সাংবাদিক হাজির ছিলেন হাসপাতাল চত্বরে। একটি বড় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত যাত্রীদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল।

তিন সাংবাদিক নিজেদের পেশাদারিত্বের খোলস ছেড়ে এগিয়ে আসেন যন্ত্রণাকাতর, রক্তাক্ত বৃদ্ধার শুশ্রূষায়- সুজাতা মেহরা, সুমন ভগত ও সাইফুল হোসেন মল্লিক। কী দেখেছিলেন তারা? সুজাতা মেহেরা বলেন, ‘একটা ঘটনা কভার করতে এসেছিলাম। হঠাৎ দেখি হাসপাতালের একটা জায়গায় ছোট জটলা। ওখানে কী হচ্ছে দেখতে আমরা এগিয়ে যাই। দেখি, এক বৃদ্ধা বসে রয়েছেন। রক্তে লাল তার শাড়ি। তখন বুঝতে পারিনি, কী হয়েছে। ওকে জিজ্ঞেস করলে বলেন, একজন তার সঙ্গে খারাপ কাজ করেছে। একজন আয়াকে পরীক্ষা করে দেখতে বলি। তিনি পরীক্ষা করে বলেন, অত্যাচার হয়েছে বৃদ্ধার সঙ্গে।’

সাংবাদিক ভগত বলেন, ‘সবাই ছবি তুলছিল বৃদ্ধার। কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। যে চারটি ছেলে ওকে হাসপাতালে এনেছিল, তারাও ভর্তি করায়নি। অনেকেই এসব ক্ষেত্রে পুলিশি ঝামেলা এড়াতে চায়। তাই সামনে আসে না। আমরা না এলে বৃদ্ধা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারতেন না।’

মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসির খান সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ‘একটা বড় দুর্ঘটনার পর অনেক আহত যাত্রীকে আনা হয়েছিল। তা নিয়ে ব্যস্ততা ছিল। তাই ব্যাপারটা অনেকক্ষণ নজর এড়িয়ে যায়। পরে বৃদ্ধাকে ভর্তি করানো হয়। সাংবাদিকরাই নিগৃহীতাকে ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করান। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করেছে।’

সাংবাদিক সুজাতা বলেন, ‘চিকিৎসক আমাকে ক্ষতস্থান দেখিয়েছেন। আমি দেখেই বুঝতে পারি, কতটা অত্যাচার চালানো হয়েছে।’

বর্ধমান মেডিকেল কলেজের স্ত্রী-রোগ বিভাগে ভর্তি রয়েছেন নিগৃহীতা। হাসপাতালের সুপার ডা. উৎপল বলেন, ‘এখন ওই বৃদ্ধার অবস্থা স্থিতিশীল। প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের চিকিৎসকরা তাকে নজরদারিতে রেখেছেন।’

তিনি বলেন, তারা এখনো পুলিশকে নিগৃহীতার জবানবন্দি রেকর্ড করার অনুমতি দেননি। কারণ জানতে চাইলে সুপার বলেন, ‘এখনো ট্রমার মধ্যে আছেন ওই বৃদ্ধা। মানসিকভাবে তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। একটু সুস্থ হলে সে কথা ভাবা যাবে।

পুলিশের ভূমিকা এবং…

পূর্ব বর্ধমান পুলিশ ধর্ষণের তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে। জেলার পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বৃদ্ধার গ্রামের বাড়িতে তদন্তে গিয়েছে পুলিশ। তার পরিবারের খোঁজ মিলেছে। দ্রুত অপরাধী ধরা পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পশ্চিমবঙ্গে ধর্ষণ বাড়তে থাকায় পুলিশ-প্রশাসন উদ্বিগ্ন। এটা যতটা আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা, তার থেকেও বড় সামাজিক সমস্যা। কামদুনি, কাকদ্বীপ, পার্কস্ট্রিট, রানাঘাটের নামের পর এবার নতুন সংযোজন বর্ধমান! কিন্তু ক্ষোভে ফেটে পড়ার মতো জনতা বর্ধমানে কোথায়? স্টেশন চত্বরে থিকথিক করা যাত্রীদের ভিড়ে অনেকে জানেন না যে, এই স্টেশন চত্বরেই সত্তর বছরের বৃদ্ধাকে শুক্রবার ধর্ষণ করা হয়েছে।

বর্ধমানে এমন ঘটনা এই প্রথম। বিষয়টি নিয়ে বর্ধমানের বাসিন্দারা খুবই অস্বস্তিতে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মনোজিৎ আচার্য চৌধুরী বললেন, ‘এমন ব্যাপার এখানে ঘটবে, ভাবিনি। নিরাপত্তা কোথাও নেই যে বোঝাই যাচ্ছে।’

স্থানীয় সাংবাদিক দেবদত্ত বলেন, ‘স্টেশন চত্বর সমাজবিরোধীদের আখড়া হয়ে উঠেছে। রাত ৯ টার পর নেশার কারবার চলে রমরমিয়ে। মহিলা পাচার থেকে শুরু করে সব অসামাজিক কাজই হয় এখানে।’

নিস্পৃহ সংবাদমাধ্যম!

এই ঘটনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম। ধর্ষণের ঘটনা ফলাও করে দেখানো হয় রাজ্যের বিভিন্ন চ্যানেলে, গুরুত্বের সঙ্গে তা প্রকাশিত হয় সংবাদপত্রেও। কিন্তু শুক্রবারের এই ঘটনা নিয়ে শনি ও রোববারও আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় নিশ্চুপ মিডিয়া। দু-একটি ওয়েব পোর্টালে বর্ধমানে বৃদ্ধার ধর্ষণের খবর জায়গা করে নিয়েছে। সেই খবর ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপারসন লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘আমি কোথাও এই খবরটা দেখিনি।’

অথচ এই সংবাদমাধ্যম কামদুনির ছাত্রীর ধর্ষণ ও হত্যা কিংবা রানাঘাটে প্রবীণ সন্ন্যাসিনী ধর্ষণের খবর যথাযথ গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশ করেছিল। কিন্তু, সেই সংবাদমাধ্যম সত্তর বছরের এই বৃদ্ধার উপর যৌন অত্যাচার নিয়ে নিস্পৃহ কেন? আনন্দবাজার পত্রিকার সাবেক ডেপুটি নিউজ এডিটর শম্ভু সেন বলেন, ‘মিডিয়া আক্রান্তের সোশ্যাল স্ট্যাটাস দেখে খবর বাছাই করে বৈকি। এটা করা উচিত নয়। এই ভূমিকা নিন্দনীয়। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’

সমাজকর্মী বোলান গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘সাধারণভাবে মিডিয়া ধর্ষণের ঘটনার আক্রান্ত কোনো টিনএজার হলে সেটা নিয়ে বেশি মাতামাতি করে। আক্রান্ত যদি প্রবীণ হন, তাহলে অতটা হেলদোল দেখা যায় না। রানাঘাটের ঘটনায় ফুটেজ পাওয়া গিয়েছিল, সে ক্ষেত্রে অপরাধ অস্বীকার করার উপায় ছিল না।

সংবাদমাধ্যমের নিস্পৃহতা সম্পর্কে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র বলেন, ‘মিডিয়া কীভাবে এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, রাজ্য সরকার মিডিয়াকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। সে জন্যই এসব ঘটনা সামনে আসছে না। ঘটনার বীভৎসতা বেশি হলে তখন কিছুটা দেখানো হচ্ছে।’

বিচার পাবেন বৃদ্ধা?
বিচার পাওয়ার লড়াই কত কঠিন, তা জানে কামদুনি, পার্কস্ট্রিট। ২০১৩ সালের ৭ জুনের কামদুনির গণধর্ষণের সেই ঘটনার পরে রাস্তায় নেমেছিল গোটা গ্রাম। স্থানীয় মহিলাদের প্রতিবাদের জবাবে মেজাজ হারিয়ে বিক্ষোভকারীদের বামপন্থি সমর্থক বলেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু কামদুনির জনতাকে কোনোভাবেই টলাতে পারেনি কেউ।

এর আগে পার্কস্ট্রিটে গভীর রাতে নাইটক্লাব থেকে বেরোনো সুজেট জর্ডনকে ধর্ষণ, তা নিয়ে রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর অসহিষ্ণু মন্তব্য, তৎকালীন নগরপালের বক্তব্য নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। কিন্তু সেই সুজেটের পাশে ছিল তার পরিবার। এ নিয়েও কম আন্দোলন হয়নি। কিন্তু সহায়সম্বলহীন ভিখারি কি বিচার পাবেন?

মানবাধিকার কর্মী শাশ্বতী ঘোষ বলেন, ‘জনগণের প্রতিবাদের ভূমিকা আছেই। স্থানীয় মানুষ যদি প্রতিবাদ না করে তাহলে পুলিশ বা প্রশাসন বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামায় না। কাকদ্বীপ বা বরানগরের ক্ষেত্রে আমরা সেটাই দেখেছি। বরানগরে এক কাগজ কুড়ুনিকে নিগ্রহ করা হয়েছিল। দু’দিন সেটার খবর নিয়ে হইচইয়ের পর সব থেমে যায়। আজ ভিখারিনির ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটেছে। কাল আমাদের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে, প্রতিবাদ না করলে প্রতিকার হবে না।’

পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে শাশ্বতী ঘোষ বলেন, ‘পুলিশ নিজের অঞ্চলে অপরাধ কম করে দেখাতে চায়। এ কারণে মামলা রুজু, তদন্তের ঝক্কি তারা পোহাতে চায় না। তাই দেখবেন, ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্তকে দোষী সব্যস্ত করার হার সারা দেশের মতোই কম।’

রানাঘাটের সত্তরোর্ধ সন্ন্যাসিনী ধর্ষণের সঙ্গে বর্ধমানের ঘটনাকে কেন এক সারিতে রাখছে না সমাজ? শাশ্বতীর মতে, ‘রানাঘাটের সন্ন্যাসিনী একটি চার্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার পেছনে মিশনারি প্রতিষ্ঠান ছিল। শুধু দেশ নয়, বিশ্বের খ্রিষ্টান সমাজ এ নিয়ে সরব হয়েছিল। এমনকি ভ্যাটিক্যান থেকেও বার্তা এসেছিল। তাই এই প্রতিবাদের ফলে পুলিশ প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল।’

‘আমরা আক্রান্ত’ সংগঠনের নেতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র শাশ্বতী ঘোষের মতোই বলেন, ‘জনতার চাপ না থাকলে বিচার হয় না। পার্কস্ট্রিটের গণধর্ষণে নিগৃহীতার অভিযোগ থানা নিতে চায়নি। পরে অভিযোগ নেয়া হলেও অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।’ -ডিডব্লিউ