চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ধান চাষিরা হতাশ, মিলছে না ন্যায্যমূল্য

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশায় পড়েছেন কৃষকরা। মাঠে ভালো ফলন হলেও বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, শ্রমিক সংকট এবং বাজারে কম দাম-সব মিলিয়ে অনেক কৃষকই ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ হারানোর শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ধানের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। তবে বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় উৎপাদনের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হলেও স্থানীয় বাজারে সেই দামের প্রতিফলন নেই। ফলে তারা বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করছেন।

হাজীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে স্থানীয় ব্যাপারিরা প্রতি মণ ধান ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনছেন। অথচ সরকার নির্ধারিত মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় এই দাম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

উপজেলার একাধিক কৃষক জানান, ধান আবাদ থেকে শুরু করে কাটা, মাড়াই ও পরিবহন পর্যন্ত ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। শুধু ধান কাটার শ্রমিকের পেছনেই জনপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করে তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন।

কৃষকদের ভাষ্য, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর পরও যদি লাভ না থাকে, তাহলে কৃষিকাজে আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কৃষকরা ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।

উপজেলার কৃষকরা জানান, গত কয়েক বছর কিছু এলাকায় সেচ সংকটের কারণে অনাবাদি জমি পড়ে থাকলেও এবার সেচ সুবিধা বাড়ায় অনেক জমিতে পুনরায় ধান চাষ সম্ভব হয়েছে। ফলে উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু বাজারমূল্য কম থাকায় সেই বাড়তি উৎপাদন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-কৃষি সংরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেন, “২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে হাজীগঞ্জ উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৭১০ হেক্টর জমি। তবে বাস্তবে আবাদ হয়েছে ৯ হাজার ৮৬৫ হেক্টর। উপজেলায় শতভাগ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মৌসুমে মোট উৎপাদন প্রায় ৪৩ হাজার ১০৫ মেট্রিক টন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে উপজেলায় ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৪২ হাজার ৬৫৩ মেট্রিক টন। সেই হিসাবে এবার ফলন বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো পূর্বে অনাবাদি থাকা জমিতে সেচ সমস্যার সমাধান হওয়ায় নতুন করে ধান চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে।”

কৃষকদের উদ্দেশ্যে তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, “কৃষকরা যদি ধান সরাসরি বিক্রি না করে প্রক্রিয়াজাত করে চাল হিসেবে বাজারজাত করতে পারেন, তাহলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হাসিব আবদুল্লাহ বলেন, “কৃষকরা যদি কিছুদিন অপেক্ষা করেন, তাহলে ধানের বাজারমূল্য আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকারিভাবে এ বছর ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। আশা করছি কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।”

তবে কৃষকদের দাবি, বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দ্রæত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা বলছেন, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবেন।

ভালো ফলনের পরও কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় হাজীগঞ্জের ধান চাষিদের মুখে এখন আনন্দের বদলে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। কৃষকরা বলছেন, কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও।