মফস্বল সাংবাদিকদের অবহেলা : কার দায়?

দেশের জেলা-উপজেলার বাইরের বিস্তৃত মফস্বল অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছেন হাজারো সংবাদকর্মী। এরা সংবাদপত্রের মেরুদণ্ড। কারণ গ্রাম-গঞ্জের বাস্তবতা, মানুষের সুখ-দুঃখ, স্থানীয় সমস্যা, প্রশাসনের অনিয়মসহ নানা বিষয় প্রতিদিনের খবরের কাগজে পৌঁছে দেন তারাই।

কিন্তু পরিহাসের বিষয়, এই পরিশ্রমী সংবাদকর্মীদের বড় অংশই কোনও বেতন-ভাতা তো দূরের কথা, ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পান না। মফস্বল সাংবাদিকতার বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। অধিকাংশ পত্রিকা অফিস মফস্বল প্রতিবেদকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দিতে আগ্রহী নয়। অনেকেই নিজের খরচে নিয়মিত খবর সংগ্রহ করেন।

যাতায়াত, ইন্টারনেট, ফোন, সরঞ্জাম- সবই ব্যক্তিগত ব্যয়ে। অথচ মাসের শেষে পত্রিকা অফিস থেকে আসে শুধু ‘খবর পাঠান’ নির্দেশনা, আসে না কোনও সম্মানী বা খোঁজখবর। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিবছর দরিদ্র ও অসুস্থ সাংবাদিকদের জন্য অনুদান প্রদান করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এ অনুদান পেয়ে থাকেন জেলা শহরের সাংবাদিকেরা।

মফস্বলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক অভিজ্ঞ সংবাদকর্মী অভিযোগ করেন, তাদের আবেদন যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে- এই অনুদান কি সত্যিই কেবল জেলা-ভিত্তিক সাংবাদিকদের জন্য? মফস্বলে বছরজুড়ে কাজ করা মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীদের প্রয়োজন কি কম?

গ্রামের সংবাদকর্মীদের জীবনযাপন অনেক সময় মানবেতর অবস্থার মতো। তাদের পরিবার, সন্তানদের পড়াশোনা, দৈনন্দিন ব্যয়- সবকিছুই নির্ভর করে অন্য উপার্জনের ওপর। সাংবাদিকতা পেশা নয়, যেন স্বেচ্ছাসেবী কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের কাছে।

অথচ এই মফস্বল সংবাদকর্মীরাই খবরের প্রথম খসড়া তৈরি করেন, তাদের পরিশ্রমেই জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকগুলো প্রাণ পায়। এ বাস্তবতার দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য আলাদা বরাদ্দ, এবং মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কর্মরত সংবাদকর্মীদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

পাশাপাশি পত্রিকা মালিকদেরও উচিত মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীদের ন্যূনতম সম্মানী নিশ্চিত করা। এটি তাদের মৌলিক অধিকার। সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সেই স্তম্ভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মফস্বল সাংবাদিকরা, যারা দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করেও অবহেলিত। তাদের প্রতি অবহেলা অব্যাহত থাকলে একদিন এই পেশাকেই টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

মফস্বল সাংবাদিকদের প্রাপ্য সম্মান, সুরক্ষা ও ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করা এখনই সময়। নইলে সংবাদমাধ্যমের ভিত্তিতে ফাটল ধরবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনস্বার্থ ও গণতন্ত্র।