রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) নির্বাচনী হাওয়া, জাপা, আওয়ামী লীগের দুর্গে বিএনপি, জামায়াতের হানা

রংপুর-২৪ পীরগঞ্জ-৬ আসনটি ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। আসনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ, ঐতিহ্যবাহী ও ভিআইপি নির্বাচনী এলাকা। স্বাধীনতোত্তর এই আসনটিতে জাতীয় নির্বাচনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রতিনিধিত্ব করেছেন হাতে গোনা কয়েকজন। এ আসনে প্রতিনিধিত্বকারীর অধিকাংশই পীরগঞ্জের বাহিরের। তাই বরাবরই নানাভাবে দেশে আলোচিত ছিলো পীরগঞ্জ-৬ আসনটি।
এ আসনেই সাবেক প্রেসিডেন্ট মরহুম হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ, শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (যদিও প্রথমবার জাতীয় পার্টির নুর মোহাম্মদ মন্ডলের কাছে হেরেছিলেন), দু’দুবার নির্বাচিত হয়েছেন দেশের প্রথম নারী স্পীকার ড: শিরীন শারমিন চৌধুরী।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ এই আসনের গুরুত্বকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে গেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের পদচারণায় পীরগঞ্জ এখন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ নির্বাচনে পীরগঞ্জ আসনটি এবার বহিরাগত মুক্ত। সব দলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হওয়ায় ভোটারদের মাঝেও বেশ উৎফুল্লতা বিরাজ করছে।তৃণমুলপর্যায়ের ভোটারদের বিশ্লেষণে জানা গেছে, লড়াই হবে দ্বিমুখী। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন বলিষ্ঠ নেতা।
বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন খ্যাত এই নেতার পক্ষে মাঠে নেমেছেন সাবেক প্রভাবশালী এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মণ্ডল।
এতে বিএনপির অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশও তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকায় ধানের শীষের পাল্লা বেশ ভারী। অন্যদিকে এবি পার্টির প্রার্থীও বিএনপিকে সমর্থন দেওয়ায় ভোটের মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা নুরুল আমিন (দাঁড়িপাল্লা) একজন সুবক্তা ও শিক্ষক হিসেবে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়। ঘরে ঘরে পৌঁছানো ‘ইসলামী দাওয়াত’ ও দলের সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক শক্তি তাঁকে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
এ আসনে জাতীয় পার্টির নূর আলম মিয়া যাদু (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের সুলতান মাহমুদ (হাতপাখা), এবি পার্টির ছাদেকুল ইসলাম (ঈগল), তাকিয়া জাহান চৌধুরী (সূর্যমুখী), খন্দকার শাহিদুল ইসলাম শাহিদ (ফুটবল), ইন্জিনিয়ার আবু জাহিদ নিউ (ঘোড়া) মাঠে রয়েছেন। তবে বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘আঁতাত’ করার অভিযোগে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে।
স্থানীয়দের মতে, আবু সাঈদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ভোটারদের মনোভাব ও প্রত্যাশার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এক সময় লাঙ্গল ও নৌকার দুর্গ হিসেবে পরিচিত পীরগঞ্জে এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। আওয়ামী লীগ মাঠছাড়া হওয়ার পর জাতীয় পার্টি অস্তিত্ব সংকটে। ফলে লড়াই এখন মূলত দুই সাবেক মিত্র– বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। গোটা পীরগঞ্জের ভোটাররা যেন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
প্রার্থীরাও কাক ডাকা ভোর হতে গভীর রাত পর্যন্ত ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও গ্রামে গ্রামে গিয়ে ভোটারদের মন জয়ের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্ঘুম রাতজেগে প্রার্থীরা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদানসহ মাইলের পর মাইল গ্রামের মেঠোপথ পায়ে হেঁটে ভোটারদের দারস্থ হচ্ছেন। ভোটারদের প্রতিক্রিয়ায় ব্যবসায়ী সুধা রঞ্জন ও মিজানুর রহমান বলেন, ‘যোগ্য প্রার্থী হিসেবে এবার সাইফুল ইসলামকেই ভোট দেব।’ অপরদিকে ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন ও জিল্লুর রহমানের মতে, ‘দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধে মাওলানা নুরুল আমিনের বিকল্প নেই।
বিএনপি প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশ পরিকল্পনায় পীরগঞ্জবাসী উজ্জীবিত। ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।’ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জামায়াতের মাওলানা নুরুল আমিন জানান, ‘দীর্ঘদিনের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে মানুষ ইনসাফ কায়েম করতে চায়। পীরগঞ্জে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে আমাদের বিজয় ইনশাআল্লাহ নিশ্চিত।’ জাতীয় পার্টির প্রার্থী নূর আলম মিয়া যাদু বলেন, ‘মানুষ লাঙ্গলে ভোট দিতে অভ্যস্ত, সুষ্ঠু ভোট হলে আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’
পীরগঞ্জ-৬ আসনে আগে মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৪ জন এবং কেন্দ্র ছিল ১১১টি। এবার ভোটার বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬২৯ জন, পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৬ হাজার ১০২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন। এই আসনে ভোটার বেড়েছে ২৫ হাজার ৯৮১ জন এবং কেন্দ্র সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৩টি। এর মধ্যে ২৯টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।






























