সাজেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে তান্ডব, বাড়িঘর ভাঙচুর-লুটপাট

টুরিজম ষ্পর্ট সাজেকের অবরোধ চলমান অব্যাহতের মধ্যে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারের’ ঘটনায় ৪জন হতাহত হয়েছে। গভীর রাতে সেনাবাহিনীর সাথে সাক্ষাৎ করা অভিযোগ উঠেছে। সাজেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে তান্ডব, বাড়িঘর ভাঙচুর-লুটপাট ও তিন গ্রামবাসীকে মারধরের অভিযোগ করেছে গ্রামবাসীরা।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের কলাবন্যে নামক জায়গায় শনিবার(৩১শে অক্টোবর) আনুমানিক বেলা পৌনে ১টার দিকে সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র গোষ্ঠী তথাকথিত জুম্ম লিবারেশন আর্মির (জেএলএ) সদস্যদের মধ্যে ভয়াবহ ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা নিজেদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এতে অন্তত; চারজন হতাহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এছাড়া কাজলংয়ের থালকুম্ভ থেকে গঙ্গারামমুখী রাস্তার ভাইবোনছড়া থুম এলাকায়ও প্রতিপক্ষের উপস্থিতি সন্দেহে ভয়ে তারা বøাংক ফায়ার বা শূন্যে গুলি ছুঁড়েছে বলে জানা গেছে।

অপরদিকে, গত রাতে সেনাবাহিনী সদস্যদের সাথে সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সাক্ষাৎ ও আলোচনা হয়েছে বলেও অভিযোগে খবর পাওয়া গেছে। তবে ঘটনাটি সম্পুর্ন মিথ্যা ও মনগড়া বানোয়াট বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’(পিসিজেএসএস) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা।

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, কলাবন্যের ঘটনায় ঘটনাস্থলেই সন্তু গ্রæুপের দু’জন সশস্ত্র সদস্য নিহত এবং আরও দুইজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত দুইজনকে ভাইবোনছড়া থুম থেকে থালকুম্ভের দিকে কাঁধে বহন করে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা।

আহত দুই সশস্ত্র সদস্যকে নিয়ে যাওয়ার সময় পথে ৪-৫জন গ্রামবাসীর সামনে পড়লে তাঁদের কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই নির্দয়ভাবে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে। এসময় তাদেরকে হতাহতের বিষয়টি গোপন রাখার জন্য কড়া ভাষায় সতর্ক করা হয়।

অন্যদিকে, ঘটনার পরপরই বাঘাইহাট জোন থেকে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল কলাবন্যে এলাকার ভাইবোনছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেয় বলে স্থানীয়রা জানান। এ সময় সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের অর্ডার করা রাতের খাবার(ভাত-তরকারি) গ্রামবাসীরা পৌঁছে দিতে গেলে তারা সেনা সদস্যদের সামনে পড়ে যান এবং সেনাসদস্যরা খাবারসহ বহনকারীদের আটকিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁদের কাছে গণ অধিকার রক্ষা কমিটির বাবুধন চাকমা এবং কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের নতুন জয় চাকমার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁদের কাছ থেকে মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে কললিস্ট পরীক্ষা করা হয় এবং চড়-থাপ্পড় মারার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সেনাসদস্যরা যখন জানতে পারেন যে খাবারগুলো সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য নেওয়া হচ্ছে, তখন আর বিলম্ব না করে ভাত-তরকারিসহ খাবার বহনকারীদের দ্রæুত ছেড়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানিয়েছেন, গত রাতে পাভেল চাকমার নেতৃত্বে সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরাও ভাইবোনছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসে। সেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ও আলোচনা হয়।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার(১লা নভেম্বর) সকালে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার পর পরই সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যরা ভাইবোনছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থান নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের ধারণা, সেনাবাহিনীর সদস্যরা সরে গিয়ে সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সেখানে অবস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে।

এদিকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার ৩৬নং সাজেক ইউনিয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএসের পরিচালিত সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠী তথাকথিত জুম্ম লিবারেশন আর্মি বা জেএলএর‘র বিরুদ্ধে এক গ্রামবাসীর বাড়িতে তান্ডব চালানো ও তিন গ্রামবাসীকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার(৩১শে অক্টোবর) ইউনিয়নের ৫নং ওয়াডের ভাইবোনছড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যরা বিমল চাকমা(পিতা: রবি সূর্য চাকমা) নামে এক ব্যক্তির বসতঘরে তান্ডব চালিয়ে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম তছনছ করে এবং কাপড়চোপড় পুড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, তারা বাড়ির গৃহপালিত মুরগি জবাই ও রান্না করে খায় এবং এক ট্রে ডিম ও দুই লিটার সয়াবিন তেল লুট করে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

একইদিন কলাবন্যে নামক এলাকায় নিজেদের মধ্যে ’ফ্রেন্ডলি ফায়ার‘ বা গোলাগুলির ঘটনায় গুরুতর আহত সদস্যদের উদয়পুরের দিকে কাঁধে বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিন ব্যক্তি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তাদের মুখোমুখি হন। গুরুতর আহতদের বহন করতে দেখার অভিযোগে ওই তিন ব্যক্তিকে মারধর করা হয়।

ভুক্তভোগীরা হলেন-থালকুম্ভ গ্রামের বাসিন্দা রিপন চাকমা(পিতা: দয়াল চাকমা), সাধন বিকাশ চাকমা(পিতা: গুলসেন চাকমা) এবং চিত্তিগুলো চাকমা(পিতা: তাঙুম চাকমা)। তাঁদের তিনজনকে বেধড়ক মারধর করার পর আহত ব্যক্তিদের বহন করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি প্রকাশ না করার জন্য কঠোর ভাষায় সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের একজন মুরুব্বি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা এলাকায় প্রকাশ্যে অবাধে তান্ডব চালাচ্ছে। সেনাবাহিনী সবকিছু দেখেও না দেখার ভাণ করছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি তাদের মধ্যে সরাসরি সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হতে আমরা দেখতে পাই।”

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, “সাজেকে সেনাবাহিনী পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপকে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে জনগণের ওপর সন্ত্রাস চাপিয়ে দিয়েছে। প্রকৃত সন্ত্রাসীদের মদদ দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।”

ওই গ্রামবাসী পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের মদদ দেওয়া বন্ধ করে তাদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি আহŸান জানান।

এর আগে এক দিনের জন্য শিথিলের জবাবে পাল্টা কর্মসূচী হিসেবে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা দীঘিনালা উপজেলা হতে টুরিজম স্পর্ট সাজেকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের প্রতিবাদে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির দিনব্যাপী অবরোধ শান্তিপুর্ন ভাবে পালিত হয়েছে। খাগড়াছড়ি পৌরসভার নেন্সি বাজার সড়কে কঠোর অবরুদ্ধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

গত রোববার(১লা নভেম্বর) সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই সড়কটিতে দীঘিনালা-খাগড়াছড়ি সড়কে কঠোর অবরুদ্ধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই সড়কটিতে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সকাল থেকেই দীঘিনালা থেকে সাজেকগামী কোনো গাড়ি ছেড়ে যায়নি। সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে কঠোরভাবে এই অবরোধ পালিত হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীসহ পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ঘন্টায় অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছেন ইউপিডিএফ সমর্থিত সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং এবং সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন।

সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে গত ২২শে অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছিল। সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(পিসিজেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করছে সংগঠন দুটি। তাদের অভিযোগ, এসব সশস্ত্র সদস্যের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। এতে খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধের সংকট বাড়ছে, বন্ধ রয়েছে পর্যটন কার্যক্রমও। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গত ২৬শে অক্টোবর উজো বাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়নি।

নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে গত ২২শে অক্টোবর থেকে সাজেক পর্যটন ভ্যালিতে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে রোববার(১লা নভেম্বর) এক দিনের জন্য সাজেক সড়কে অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে পাহাড়ি স¤প্রদায়ের মাসব্যাপী ধর্মীয় উৎসব কঠিন চীবর দান উপলক্ষে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চলাচলের জন্য যানবাহন প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘেœ কঠিন চীবর দানোৎসব পালন করতে পারেন, সে জন্য আলোচনা সাপেক্ষে বিশেষ শিথিলতার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আন্দোলনকারী দুই সংগঠনের নেতারা। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বিহার কর্তৃপক্ষকে অবরোধকারী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। গত রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরোধ শিথিল ছিল।

পরদিন সোমবার(২রা নভেম্বর) থেকে আবারও অবরোধ কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহŸায়ক বাবুধন চাকমা। গত শুক্রবার(৩০শে অক্টোবর) রাত পৌনে ৮টার দিকে এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ ঘোষণা দেন। তৃতীয় দফার অবরোধের নবম দিন শেষে শুক্রবার রাতে এক দিনের জন্য কর্মসূচি শিথিলের ঘোষণা দেয় আন্দোলনকারী সংগঠন দুটি।

অপরদিকে দফায় দফায় সাজেক সড়কে অবরোধের কারণে এলাকায় মারাত্মক মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। অবরোধের ফলে সাজেকের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে একদিকে পর্যটন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে সাজেক ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি দুর্গম গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর পাশাপাশি তীব্র ওষুধ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ সংকট মোকাবিলা ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য গত রোববার (২৫শে অক্টোবর) তিন সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। এরপর গত সোমবার(২৬শে অক্টোবর সংকট নিরসনে প্রথমবারের মতো রাঙ্গামাটি থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল সাজেকের উজোবাজারে যায়।

প্রতিনিধিদলে ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির ২৯৮নং আসনে সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক এবং দুই জেলার পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সেখানে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা ও ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। দীর্ঘ আলোচনায় পাঁচ দফার মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও একটি দাবিতে সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে সংগঠন দুটি। অবরোধ অব্যাহত থাকায় সাজেক ইউনিয়নের ৩০হাজারের বেশি বাসিন্দা বিভিন্ন সংকটে পড়েছেন।

এর আগে সাজেক থেকে পিসিজেএসএসের সন্তু প্রæুপের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে সড়ক অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করে ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত সংগঠন দুটি। প্রথম দফায় গত ১১ই অক্টোবর অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। ওই সময় সাজেকে প্রায় দেড় হাজার পর্যটক আটকা পড়লে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে ৪৮ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।

আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে গত ১৫ই অক্টোবর থেকে দ্বিতীয় দফায় অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এরই মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হলে গত ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়। ছয় দিনের বিরতি শেষে ২২শে অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি পালন করে আসছিল সংগঠন দুটি।

অন্যদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ২২শে অক্টোবর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটন ভ্যালি বন্ধ ঘোষণা করে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন। একই দিন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র থেকে পর্যটকদের খাগড়াছড়ি উ্েদ্দশ্যে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়।

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের ডাকা সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ রোববার(১ল নভেম্বর) একদিনের জন্য শিথিল করা হয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে অটোরিক্সা চলাচল করছে বলে জানা গেছে। তবে সেটলাররা ও বিশেষ মহল পরিকল্পিতভাবে দীঘিনালা ও খাগড়াছড়ির দিক থেকে গাড়ি চলাচলে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অপরদিকে, পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আবারো গঙ্গারাম ভাইবোনছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থান নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

গত রোববার বাঘাইহাট বাজারের সাপ্তাহিক হাটবার। দোকানদাররা দীঘিনালা থেকে যেসব মালামাল নিয়ে এসেছেন সেগুলো বাঘাইহাট সেনা জোনে আটকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে হাট-বাজার মোটামুটি চলছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। মাচলং ও গঙ্গারাম এলাকার কলা ব্যবসায়ীরা যেসব কলা ক্রয় করেছেন সেগুলো নিতে পারছেন না বলেও খবর পাওয়া গেছে। সেটলাররা দীঘিনালা ও খাগড়াছড়ির দিকে গাড়ি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করায় তারা এ সমস্যায় পড়েছেন।

পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা আবারও গঙ্গারাম এলাকার ভাইবোনছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে গত(শনিবার) তারা সেখানে এসে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়েছিল। পরে সেখান থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়। সেনাবাহিনীর একটি দল সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অবস্থান থেকে এক কিলোমিটারের কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থান করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

তবে সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তাদের কোন পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি। ফলে সন্তু গ্রæুপের সন্ত্রাসীদের সাথে সেনাবাহিনীর কোন যোগসাজশ রয়েছে কি-না তা নিয়ে এলাকাবাসী সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রশাসন পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করে উল্টো সাজেকবাসীর আন্দোলন বানচাল করে দেয়ার লক্ষ্যে তাদেরকে মাচলং এলাকা থেকে গঙ্গারাম এলাকায় নিয়ে আসা হয়েছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন।

সাজেকের উজোবাজারে হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ, পর্যটন সড়কে অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্য জেলার রাঙামাটির সাজেকের উজোবাজারে শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকালে সেনা হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি। টুরিজম ষ্পর্ট সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অবরোধ অব্যাহত রয়েছে কিন্তু যানবাহন চলাচল করছে না। এলকার খাদ্য সংকট ও কঠিন চীবরদান উপলক্ষে রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরোধ একদিন শিথিল থাকার কথা। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।
সাজেক থানার ওসি মো: তোফাজ্জল হোসেন আরো বলেন, মাচলং সেনা ক্যাম্প থেকে আমাকে পুলিশ ফোর্স পাঠাতে বলা হয়। দুর পাল্লা কোন যানবাহন চলাচল করেনি।

সাজেকবাসীর ৫দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহŸান সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির:- সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে।

গত শনিবার(২৪শে অক্টোবর ২০২৬) সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহŸায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ২২শে অক্টোবর শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের উপর হামলার প্রেক্ষিতে জনগণের পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন।

দাবিগুলো হলো: ১) গত ২২শে অক্টোবর ২০২৬ শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের উপর বিনা উস্কানিতে হামলার সাথে জড়িতদের শাস্তি দিতে হবে এবং গোলাগুলির মিথ্যা নাটক সাজিয়ে ৩০জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০০০জনের নামে দায়ের করা মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।

২) উজো বাজারের স্থানীয় দোকান ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। উজোবাজার থেকে সেনা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরকে সরিয়ে নিতে হবে।

৩) সেনাবাহিনী কর্তৃক যে সকল নারী-পুরুষকে মারধর করে আহত করা হয়েছে তাদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ভার গ্রহণ করতে হবে।
৪) সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পিসিজেএসএস সন্তু লারমা গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সাজেক থেকে অতি দ্রæুত সরিয়ে নিতে হবে। তাদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধ করতে হবে।

৫) আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের কাউকে সন্ত্রাসী তকমা লাগিয়ে গ্রেফতার, হয়রানি ও তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি করা যাবে না।

​সা¤প্রতিক সময়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে জোট নেতৃবৃন্দ বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছিলেন‘ পাহাড়ে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়’। দেশ রক্ষা ও নাগরিক সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর এমন বক্তব্য কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ধরনের মন্তব্য মূলত পাহাড়ি জনগণের ওপর চলমান নিপীড়নকে প্রকাশ্যে আইনি বৈধতা দেওয়ারই সামিল। যার ফলে খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতায় সাজেকেও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলি চালানো সম্ভব হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী নিজেদের স্বার্থে ও গণবিরোধী কর্মকান্ড জায়েজ করতে মদদপুষ্ট সশস্ত্র প্রক্সি গ্রæুপ তৈরি করে পাহাড়ে অরাজকতা টিকিয়ে রাখছে।

সাজেকবাসী জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সেনাপোষ্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষকে তল্লাশি ও হয়রানি বন্ধের ৩দফা দাবিতে পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি পালন করছিল। কিন্তু সেই কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী চড়াও হয়ে লাঠিচার্জ ও এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে।

এ ববর হামলায় অন্তত ৬০জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সাজেকের উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের ওপর এ হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে দেশে বর্তমানে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট পাহাড়ি জনগণের এই ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছে। একই সাথে অবিলম্বে এ কৃত্রিম সংকট বন্ধে সরকারকে দ্রæুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহŸান জানাচ্ছে।

বিবৃতিতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেছেন-গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট ও সভাপতি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিকী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল সভাপতি ছায়েদুল হক নিশান, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি তামজিদ হায়দার চঞ্চল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী সভাপতি শাহরিয়ার খন্দকার আলিফ, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি) সভাপতি সমর চাকমা এবং বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন সহ-সভাপতি নাঈম উদ্দীন।

সাজেক চালুর দাবিতে ৪৮ঘণ্টার আল্টিমেটাম, পাল্টা সড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি:-
পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে চলমান সড়ক অবরোধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন খাগড়াছড়ির পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন নেতারা। আগামী ৪৮ঘণ্টার মধ্যে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দ্রæুত অবরোধ প্রত্যাহার না হলে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

শুক্রবার(২৩শে অক্টোবর) বিকেলে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ গেটের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়। শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মিছিলটি শাপলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের দ্ব›েদ্ধ বারবার বন্ধ হয়ে পড়ছে সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম।

এতে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে, যা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রটির ভাবমূতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অবরোধের দ্বিতীয় দিনে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। সকাল থেকে অবরোধের সমর্থনে কোনো মিছিল বা পিকেটিংও দেখা যায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ৪৮ঘণ্টার মধ্যে সাজেক খুলে দেওয়ার দাবি ও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিতে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে পর্যটন খাতের ক্ষতি বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

এর আগে ১৫ই অক্টোবর সকাল ছয়টা থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে দ্বিতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেন সাজেক গণ–অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও গাছের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। বাঘাইহাটের ১০নম্বর এলাকা, গঙ্গারাম সেতু ও মাচলঙের ১৪কিলোসহ কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধ করা হয়। এতে সাজেকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(পিসিজেএসএস)। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ইউপিডিএফের চাপে সংগঠন দুটি অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

স¤প্রতি সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে সাজেকের মাচলং বাজার ও উজো বাজার এলাকায় কয়েক দফায় ইউপিডিএফের নির্দেশে ও মদদে প্রথম সড়ক অবরোধ শুরু হয়। সাজেকের মাচলং এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে তথাকথিত ‘পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেয়া’র দাবিতে গত ১১ই অক্টোবর এই সড়ক অবরোধ শুরু করা হয়।

দুর্গোৎসবের কারণ দেখিয়ে ১৬-২১শে অক্টোবর সড়ক অবরোধ স্থগিত করা হয়। গত ২২শে অক্টোবর থেকে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলাব্যাপী এই সড়ক অবরোধ স¤প্রসারণ করা হয়। তবে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির অধিকাংশ এলাকায় এই সড়ক কার্যকর হয়নি বলে পিসিজেএসএস দাবি করেছে। যে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন সাজেকবাসীকে জিম্মি করে রেখেছে, সেই ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরাই আবার জেএসএসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সড়ক অবরোধ ডাকাকে অনেকেই হাস্যকর বলে অভিহিত করেছেন।

সাজেক ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা খুন, অপহরণ, হয়রানি, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, গ্রামবাসীদের বেগার খাটানো, কথায় কথায় বাজার অবরোধ, সড়ক অবরোধ, জনগণের সম্পত্তি ধ্বংসসহ নানা সন্ত্রাসী ও জনস্বার্থ বিরোধী কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে। এপর্যন্ত এই এলাকায় তারা বহু নিরীহ মানুষ, চুক্তির সমর্থক গ্রামবাসীকে অপহরণ, খুন ও মারধর করেছে। তবে ইতোমধ্যে তারা বহু এলাকায় জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে।

অবরোধের কারণে গত রোববার পর্যটকবাহী যানবাহন সাজেকে আটকা পড়েছিল। ওই দিন সন্ধ্যায় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণায় ১৫ই অক্টোবর এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

অপরদিকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের(ইউপিডিএফ)’র মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেছেন, “মূলত পিসিজেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে।”

অপর এক বিবৃতিতে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ সাজেকে শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা বিবৃতিতে বলেছেন, “সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবি এলাকা থেকে পিসিজেএসএস সন্তু লারমা গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে না নিয়ে, তাদের অত্যাচার ও সশস্ত্র সন্ত্রাস বন্ধ না করে, উল্টো নিরীহ সাজেকবাসীর উপর বিনা উস্কানিতে হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এই হামলা সন্ত্রাসীদের রক্ষার জন্যই করা হয়েছে।”

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২০৩ বিগেড’র ভাষ্যমতে, পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইউপিডিএফের গুলিবর্ষণ হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তিন হাজার পর্যটক উদ্ধার। তবে ইউপিডিএফ সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সেনাবাহিনীর গোলাগুলির খবর সত্য নয় বলে মন্তব্য করেছে। পার্বত্য রাঙামাটির সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর গুলিবর্ষণ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের(ইউপিডিএফ)।

এ ঘটনায় সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাজেকে ভ্রমণরত অবস্থায় আটকা পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর) এ ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে ২০৩ব্রিগেড’র বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে।

আইএসপিআরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ধরনের সহিংসতা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা, পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরপূর্বক অবরোধে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স¤প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানায় আইএসপিআর।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)র মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে বলেন, রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপারের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকাসহ কতিপয় সংবাদ মাধ্যমে বাঘাইছড়ির সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে গত বৃহষ্পতিবার দুপুরে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি চলেছে বলে যে খবর প্রচার করা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট আখ্যায়িত করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)।

গত বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর ২০২৬) কোন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার জনগণের সাথে কথা বলে এমন খবরের সত্যতার বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনি। মূলত পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইউপিডিএফের অংগ্য মারমা আরো বলেন, শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের উপর ববর হামলা, লাঠিচার্জ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও নিন্দা জানান। তিনি অবিলম্বে সাজেকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে উক্ত এলাকা থেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সরিয়ে নেওয়ার ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)’র প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। সাজেক যাওয়ার বাঘাইহাট স্টেশনের লাইনম্যান মো: জসিম বলেন, অবরোধকারীরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং করছেন। যার কারণে খাগড়াছড়ি-রাংগামাটি-সাজেক সড়কে স্থানীয় যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

সাজেক অবরোধ চলছে গণ অধিকার রক্ষা কমিটির ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামের দুটি সংগঠনের ডাকে। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা বলেন, ‘সাজেকে সড়ক অবরোধ এখনো চলমান। সাজেক ১০নম্বর ও ১৪কিলোমিটার এলাকায় আমাদের পিকেটিং চলছে।’

রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব ঘটনার গত বুহষ্পতিবার দুপুরে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, অবরোধকারীদের হামলায় সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য জখম হয়েছেন। প্রায় দুই ঘণ্টার এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির পর নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় অবরোধকারীদের হামলায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের অন্তত ছয় সদস্য আহত হয়েছেন। সাজেক থেকে পর্যটকদের গাড়িবহর ছেড়ে যাচ্ছে এমন সময় সাজেকে অবরোধকারীদের হামলায় সেনা-পুলিশসহ ৬জন আহত হয়েছে। রাঙামাটির সাজেক সড়কের উজোবাজারে গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

পর্যটকবাহী যানবাহন পার করে দেওয়ার জন্য সড়কের ব্যারিকেড সরানোর আহŸান জানালে অবরোধকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে প্রথমে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে অবরোধকারীরা গুলিবর্ষণ শুরু করলে আত্মরক্ষার্থে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। এতে দুপুর একটা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা উভয় পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে ব্যাপক গুলিবিনিময় চলে।

পুলিশ সুপার আরও জানান, সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হলেও সাজেকে অবস্থানরত সব পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে দিঘীনালার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এই সশস্ত্র হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পার্বত্য রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার(ইউএনও) সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, সাজেকে গতকাল যে রকম ঘটনা ঘটেছিল, রাঙামাটি সে রকম পরিস্থিতি নেই। স্বাভাবিক সাধারন মানুষ চলাচল করছে। আমরা এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’

রাঙামাটির পার্বত্য জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার(ইউএনও) সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, সাজেকে গতকাল যে রকম ঘটনা ঘটেছিল, রাঙামাটি সে রকম পরিস্থিতি নেই। স্বাভাবিক সাধারন মানুষ চলাচল করছে। আমরা এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’

রাংগামাটির ২৯৯নং আসনে সংসদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি বলেন, অবগত হয়েছি, আমলা চাচ্ছি যে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম তারা ৫দফা দাবী দিয়েছে। আমরা তাদের সাথে বসব। এটি দৃশ্যমান না, ওদের সাথে বসতে চায়, আমরা সরকারের আলোচনা বিশ^াসী। আমরা আশা করছি, অচিরেই তা সমাধান হবে।

গত ১১ই অক্টোবর অবরোধ পালনকালে বিকেলে স্থানীয় সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন দুই সংগঠন ও সাজেকবাসীর উত্থাপিত তিন দফা দাবি বা শর্ত মেনে নিলে ৪৮ঘন্টার জন্য সড়ক অবরোধ স্থগিত করা হয়। এরপর শর্ত পূরণ না হওয়ায় ১৫ই অক্টোবর আবার তারা অবরোধ পালন করে। পরে শারদীয় দুর্গোৎসবের কারণে ১৬থেকে ২১শে অক্টেবর অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর) সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ চলাকালে সেনাবাহিনী হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে ওই দিনই ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় এই আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেয়।

গত ২২শে অক্টোবর রাঙামাটির সাজেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ ৩দফা বাস্তবায়নের দাবিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের তৃতীয় দফা শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকালে সেনাবাহিনী হামলা চালায়। এ সময় তারা বেপরোয়া লাঠিচার্জ, গুলিবর্ষণ ও ঘরবাড়ি ভাংচুর করে।

এতে ৭০জনের অধিক নারী-পুরুষ আহত হন। এর আগে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ছাত্র জনতার সংগ্রাম পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথে অবরোধের ডাক দেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, সাজেক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(পিসিজেএসএস) ‘সশস্ত্র সদস্যদের’ সরিয়ে নেয়াসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে আবারও তৃতীয় দফায় রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ডাকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন নামে স্থানীয় দুটি সংগঠন।

তবে সংগঠন দুটি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ ঘনিষ্ঠ। সাজেকে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সশস্ত্র উপস্থিতির অভিযোগটি বরাবরই অসত্য বলে আসছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)।

এ নিয়ে চার দফায় অবরোধ কর্মসূচির জেরে এখন থমথমে সাজেক উপত্যকা।

গত শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। গত বৃহষ্পতিবার সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবতিতে সংগঠনটি এই অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। এর আগে সাজেকে গুলাগুলির ঘটনার পর রাঙামাটির সাজেকে সড়ক অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ শনিবার-২৪শে অক্টোবর থেকে আবার চতুর্থ দফায় অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ঘোষণা, পর্যটকদের চলে আসার অনুরোধ করেছিল।

গত বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ শুরু হলে পিকেটার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সঘর্ষের জাড়িয়ে পড়ে। তাই শুক্রবারের মধ্যে সাজেক থেকে সব পর্যটককে চলে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা। এতে শনিবার(২৪শে অক্টোবর) রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি ২টি জেলায় অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।

গত বৃহস্পতিবার(২২শে অক্টোবর) বিকেলে সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এ কর্মসূচি ঘোষণা করে। বিবৃতিতে বলা হয়, সাজেকে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রæুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার দাবিতে ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদ এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে এ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা জানান জানান।

এর আগে রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক পর্যটন সড়কে তৃতীয় দফায় অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। গত শুক্রবার বিকেলে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা ও সাজেক গণ–অধিকার রক্ষা কমিটির আহŸায়ক বাবুধন চাকমার সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, এর আগে বাঘাইহাট ও মাচলং বাজার দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন কমিটির অনুরোধে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত শুক্রবার থেকে বুধবার পর্যন্ত সড়ক অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। দাবি পূরণ না হওয়ায় পূজা শেষে গত বৃহষ্পতিবার থেকে আবারও রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে আজকের মধ্যেই পর্যটকদের সাজেক ত্যাগ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। বৃহষ্পতিবার(২২শে অক্টোবর) নিরাপত্তাবাহিনী লাঠি চার্জ, হামলা, গুলিবর্ষনের নাটকের প্রতিবাদে পুন:রায় সড়ক অবরোধ ঘোষনা দেয়।

গত ১১ই অক্টোবর সাজেকের উজোবাজার এলাকায় সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের ডাকা সড়ক অবরোধ পালনকালে ঝর্ণা চাকমা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে সেনাবাহিনীর নিপীড়নের বিষয়ে তুলে ধরেন। এরপর সেনাবাহিনী ঝর্ণা চাকমাকে খোঁজ করে এবং ক্যাম্পে হাজির হতে নির্দেশ প্রদান করে। পরে এ নিয়ে ঝর্ণা চাকমা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সেনাবাহিনী তাকে খোঁজ করার বিষয়টি জানায়।

এর আগে থমথমে ঘটনাকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের আধাবেলা অবরোধ শান্তিপূর্ন ভাবে পালিত হয়েছে। চতুর্থ দফা ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের ডাকে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি সকাল ৫টা থেকে শুরু করে দুপুর ১২টায় শেষ হয়েছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চলা আধাবেলা অবরোধে যান চলাচল বন্ধ ছিল।

উল্লেখ্য, পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া ও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধের দাবিসহ কয়েকটি দাবিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে সাজেকবাসী আন্দোলন করছেন। গত ২২শে অক্টোবর তাদের শান্তিপূর্ণ অবরোধে সেনাবাহিনীর হামলার পর গত ২৬শে অক্টোবর সরকারের একটি প্রতিনিধি দল আন্দোলনকারীদের সাথে বৈঠক করলেও তা তেমন ফলপ্রসু হয়নি। ফলে সেখানে এখনো অবরোধ-আন্দোলন চলমান রয়েছে।