গৌরীপুরের কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির শতবর্ষী নাগলিঙ্গম গাছ: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ– সময়ের স্রোতে বহু রাজবংশ হারিয়ে গেলেও, তাদের স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছু অনন্য নির্দশন। এমনই এক জীবন্ত সাক্ষী হলো ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ঐতিহাসিক কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে অবস্থিত বিরল ও প্রাচীন এক নাগলিঙ্গম গাছ। বর্তমান গৌরীপুর থানার ঠিক পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃক্ষটি কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, এটি যেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
ইতিহাসের আধার ও রাজকীয় ঐতিহ্যঃ
কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এই গাছটি বহু দশক ধরে প্রাঙ্গণটি অলঙ্কৃত করে রেখেছে। স্থানীয় জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই নাগলিঙ্গম গাছটি প্রায় দুই শতাব্দীর পুরোনো হতে পারে। গাছটির সঠিক রোপণকাল নিয়ে মতভেদ থাকলেও, ধারণা করা হয় এটি নারী জমিদার গঙ্গাদেবীর শাসনামলে, অথবা ছোট তরফের জমিদার তারিণীকান্ত লাহিড়ি চৌধুরী (১৮০৭–১৮৮৪) কিংবা তাঁর দত্তকপুত্র ধরণীকান্ত লাহিড়ি চৌধুরীর আমলে রোপণ করা হয়েছিল।
গবেষক ও স্থানীয়দের মতে, এই গাছটি কালীপুর রাজপরিবারের প্রকৃতিপ্রেম এবং স্থানীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক। সময়ের অসংখ্য পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী এই বৃক্ষটি আজও তার মহিমা ধরে রেখেছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বঃ
ভারত ও বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম গাছ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বহু শিবমন্দিরের প্রাঙ্গণে এই গাছ দেখা যায়। গৌরীপুরের এই নাগলিঙ্গম গাছটির কাছে ‘হরগঙ্গেশ্বর’ নামে দুটি প্রাচীন শিবমন্দির অবস্থিত, যা এর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনন্য বৈশিষ্ট্য ও নামরহস্যঃ
নাগলিঙ্গমের বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis এবং এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। গাছটির বিশাল কাণ্ড, বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা, কাণ্ডজুড়ে ফোটা সুগন্ধি ফুল এবং বড় গোলাকার ফল একে অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। এই গাছটির নামকরণের পেছনে রয়েছে এক চমৎকার ইতিহাস।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একসময় কালীপুর রাজবাড়ির হাতিশালার হাতিদের এই গাছের ফল খাওয়ানো হতো। নাগলিঙ্গমের ফল আকারে বড় ও গোলাকার হওয়ায় এটি কামানের গোলার মতো দেখতে। এ কারণেই ইংরেজিতে গাছটিকে ‘Cannonball Tree’ বা ‘কামানের গোলা গাছ’ বলা হয়।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো এর ফুল। নাগলিঙ্গম ফুল বিশ্বের অন্যতম ব্যতিক্রমী ফুলগুলোর মধ্যে একটি। ফুলের কেন্দ্রীয় অংশ দেখতে অবিকল শিবলিঙ্গের মতো এবং এর পরাগবাহী অংশ সাপের ফণার আকৃতির হওয়ায়, এর নাম হয়েছে “নাগলিঙ্গম”। সুগন্ধে ভরপুর এই ফুল সাধারণত মার্চ থেকে জুলাই মাসে বেশি ফোটে। ফুল ফোটার মৌসুমে প্রকৃতিপ্রেমী, গবেষক ও দর্শনার্থীদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎঃ
ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরি এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাফেয়ার্স-এর যৌথ উদ্যোগে মোমেনসিং পরগনা, জামালপুরের জাফরশাহী পরগনা ও বগুড়ার শেলবর্ষ পরগণার প্রাচীন নিদর্শন খোঁজার জন্য ২০২০ হতে জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমান প্রজন্ম জমিদারির সঠিক ইতিহাস কেউ জানে না। ২০২৩ সালে গৌরীপুরের ঐতিহাসিক কালীপুর এলাকায় জরিপের সময় এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে ছোটতরফ জমিদারি ও নাগলিঙ্গম গাছের বিষয়ে কথা হয়।
জরিপ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এখনও এই গাছটি নিয়ে গবেষণা চলছে। পরিবেশবিদদের মতে, এ ধরনের ঐতিহাসিক বৃক্ষ সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি বিরল উদ্ভিদকে রক্ষা করা নয়; একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা।
মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক, গবেষক ও ইতিহাস সন্ধানী।






























