উষ্ণ ঘরের বাইরে হাড় কাঁপানো রাত, খুলনার ফুটপাতে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই

রাত গভীর হলে ব্যস্ততম খুলনা মহানগরী ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। দোকানের শাটার নামে, যানবাহনের শব্দ থেমে যায়, মানুষ ফিরে যায় আপন নীড়ে—নিরাপদ বিছানায়, উষ্ণ লেপ-কম্বলের নিচে।
কিন্তু এই শহরেরই আরেক শ্রেণির মানুষ, যাদের কোনো ঘর নেই, কোনো ঠিকানা নেই—তারা রাত নামলেই বিছানা পাতে ফুটপাতে। গাছের নিচে, মার্কেটের সামনে কিংবা বাস টার্মিনালের খোলা জায়গায় কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে পড়েন অসহায়, সম্বলহীন ছিন্নমূল মানুষগুলো।
শীত এলেই বিত্তবানরা কিনে নেন নতুন সোয়েটার, ভারী কম্বল আর উষ্ণ লেপ। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন ঠান্ডা থেকে। অথচ ঠিক সেই সময়েই খোলা আকাশের নিচে থাকা এসব মানুষ ঠান্ডা থেকে বাঁচতে তাকিয়ে থাকেন—কেউ হয়তো একটি পুরোনো কম্বল বা গরম কাপড় দেবে, সেই ক্ষীণ আশায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর বিভিন্ন মার্কেটের সামনে, শিববাড়ি ফুটপাত, সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত ভাসমান মানুষ শীতের রাত পার করছেন নিরুপায়ভাবে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় কাবু শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ।
কেউ পুরোনো পলিথিন গায়ে জড়িয়ে, কেউ ছেঁড়া কাপড় দিয়ে শরীর ঢেকে শুয়ে আছেন। কারও চোখে ঘুম নেই, শুধু দীর্ঘশ্বাস আর নিরব অপেক্ষা—এই বুঝি কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল।
নগরীর শিববাড়ি মোড়ের ফুটপাতে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব সাঈদের সঙ্গে। জীবনের এত বছর পেরিয়ে এসেও তার কোনো ভিটেমাটি নেই, নেই ঘর-বাড়ি—পথই এখন তার একমাত্র ঠিকানা। দিনভর এদিক-সেদিক ঘুরে কোনোভাবে সময় কাটে, আর রাত নামলেই শরীরটা শুইয়ে দেন ঠান্ডা পিচঢালা ফুটপাতে।
কাঁপতে কাঁপতে তিনি বলেন- বাবা, থাকার জায়গা নাই… কম্বলও নাই… শীতটা খুব কষ্ট দিছে। তার কাঁপা গলায় জমে থাকা কষ্ট স্পর্শ করে যায় শহরের নরম আলোকেও। যেখানে মানুষ উষ্ণ লেপে ঘুমোয় নিশ্চিন্তে- সেই একই শহরে সাঈদের মতো কেউ কেউ এখনো লড়ছে কেবল একটি উষ্ণ রাতের জন্য।
খুলনা রেলওয়ে স্টেশনের এক কোণে ফুটপাতের ওপর বসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব হাসিনা। চারদিকে হাড়কাঁপানো শীত, তার গায়ে জড়িয়ে রাখা একটি পুরোনো শাল—যা ঠান্ডা মোটেও ঠেকাতে পারছে না।
কাঁপতে কাঁপতে তিনি ধীরে বলেন— মাইয়া-বিয়া দিছি, কেউ কাছে নাই… থাকতে জায়গা নাই। শীতটা খুব লাগে… কম্বল থাকলে হয়তো একটু ঘুমাইতে পারতাম। তার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দে ধরা পড়ে অসহায় জীবনের দীর্ঘশ্বাস। স্টেশনের আলো ঝলমলে মানুষের ভিড়ের মাঝেও তিনি যেন একা—অদৃশ্য, অবহেলিত এক জীবন…
এই শহর আলোকিত হলেও তাদের জীবন অন্ধকারে ঢাকা। প্রশ্ন থেকে যায়—এই শীতে কতটা উষ্ণ হতে পেরেছি আমরা? কেবল নিজেদের ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকবে মানবিকতা, নাকি ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর পাশেও পৌঁছাবে উষ্ণতার স্পর্শ?
শীতের রাতে খুলনার ফুটপাতে যারা ঘুমায়—তারা কোনো পরিসংখ্যান নয়, তারা মানুষ। একটু উষ্ণতা, একটু মানবিকতা হয়তো বদলে দিতে পারে তাদের একটি রাত, একটি জীবন।





























