ভাস্কর্যে কথা বলছে খুলনার মোড়গুলো

খুলনা শহরে এখন শুধু সড়ক নয়—কথা বলছে মোড়গুলো। কংক্রিট আর যানজটের নগরীতে এক ব্যতিক্রমী নান্দনিকতা যোগ করেছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত ভাস্কর্য ও প্রতীক। এসব স্থাপনায় ফুটে উঠছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির বহুমাত্রিক গল্প যেন প্রতিটি মোড় বহন করছে খুলনার নিজস্ব পরিচয়।

শিববাড়ি মোড়ে স্থাপিত বধুসহ পালকির ভাস্কর্যটি নগরবাসীকে ফিরিয়ে নেয় জমিদারি আমলের খুলনায়। একসময় পালকি ছিল আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই শিল্পকর্ম অতীত ও বর্তমানের মাঝে এক নীরব সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।

শহরের আরেকটি আইল্যান্ডে থাকা দুটি হরিণের ভাস্কর্য প্রকৃতিপ্রধান খুলনা ও সুন্দরবনের নিবিড় সম্পর্কের প্রতীক। এটি নগরের ভেতরেই বন্যপ্রাণ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের বার্তা দেয়।

রয়েল মোড়ে স্থাপিত বাঘ ও চিংড়ির ভাস্কর্য খুলনার প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক অনন্য উপস্থাপন। বাঘ সুন্দরবনের শক্তি ও সাহসের প্রতীক, আর চিংড়ি খুলনার অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত।

জোড়াগেট মোড়ে আকাশে উড্ডয়নের প্রস্তুতিতে থাকা বিমানের ভাস্কর্য আধুনিক যোগাযোগ ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে গোয়ালখালী মোড়ে স্থাপিত জাহাজের ভাস্কর্য নদীবন্দরনির্ভর খুলনার শিল্প ও নৌ-বাণিজ্যের ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে।

নগরের প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেটের সামনে স্থাপিত ‘আই লাভ খুলনা’ প্রতীকটি শহরবাসীর আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ছবি তোলার জনপ্রিয় এই স্থাপনাটি নতুন প্রজন্মের কাছে খুলনার প্রতি ভালোবাসাকে দৃশ্যমান করেছে।

এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন ময়লাপোতা মোড়। সেখানে স্থাপিত স্টিলের তৈরি গোলপাতা গাছ সুন্দরবন ও উপকূলীয় জীবনের প্রতীক হিসেবে নজর কাড়ছে। প্রকৃত গোলপাতার আদলে নির্মিত এই শিল্পকর্ম নগরের মাঝেই উপকূলের আবহ এনে দিয়েছে। একই মোড়ে থাকা কংক্রিটের তৈরি সার্ট গম্বুজ মসজিদের ভাস্কর্য খুলনার ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ইসলামী স্থাপত্য ঐতিহ্যের প্রতিফলন।

এছাড়া নগরীর বিজয় গাথা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে সড়কের ওপর নির্মিত বিশাল বাবুই পাখির বাসা ভাস্কর্য নগরের প্রাণবৈচিত্র্য ও জনজীবনের এক অনন্য সংমিশ্রণ তৈরি করেছে। এটি মনে করিয়ে দেয়—শহরের মাঝেও প্রকৃতি টিকে থাকে মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার বাসিন্দা শিকদার আশিকুর রহমান বলেন, আগে এসব মোড় শুধু যানজট আর ধুলোর জন্য পরিচিত ছিল। এখন ভাস্কর্যগুলোর কারণে থামতে ইচ্ছে করে, তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। মনে হয় শহরটা আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।

সাংবাদিক জাহিদুর রহমান বলেন, এই ভাস্কর্যগুলো শুধু সৌন্দর্য নয়, এগুলো খুলনার ইতিহাস ও পরিচয়ের ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে খুলনার নগর সংস্কৃতিতে এটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।

শিক্ষার্থী মহরমান হাসান মাহিম বলেন, খুলনার মোড়গুলোতে ভাস্কর্য বসানোর ফলে শহরটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়। প্রতিদিন চলাচলের পথে এগুলো আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশেষ করে তরুণদের জন্য এটি এক ধরনের নীরব শিক্ষাও বটে—নিজের শহরকে জানার ও ভালোবাসার।

বস্তুত, খুলনার মোড়গুলো এখন আর কেবল রাস্তার সংযোগস্থল নয় বরং একটি শহরের আত্মকথা। যেখানে ভাস্কর্য, প্রতীক আর প্রকৃতি একসঙ্গে নীরবে কথা বলে। যে থামে, তাকায়, সে শুধু দৃশ্যই দেখে না খুঁজে পায় খুলনার গভীর ও জীবন্ত গল্প।