খুলনায় এনসিপি নেতা গুলিবিদ্ধ: পরিবারের অভিযোগ ‘পূর্বপরিকল্পিত, তন্বী আটক

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠনের খুলনা বিভাগীয় আহ্বায়ক মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে খুলনার রাজনৈতিক ও শ্রমিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে পরিবার ও সংগঠনের নেতাদের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত হামলা দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশের উদ্ধারকৃত আলামত ও তদন্তের অগ্রগতি নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) রাত ৯টায় খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মোতালেব শিকদারের পরিবার ও জাতীয় শ্রমিক শক্তি খুলনা জেলা কমিটির নেতারা অভিযোগ করেন, তন্বী ও মিরাজ দম্পতির বাসায় পরিকল্পিতভাবেই মোতালেব শিকদারকে গুলি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মোতালেব শিকদারের স্ত্রী ফাহিমা আক্তার বলেন, তন্বীকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই এই ঘটনার আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।
জাতীয় শ্রমিক শক্তি খুলনা জেলা কমিটির আহ্বায়ক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে মোতালেব শিকদার কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণে জড়িত ছিলেন, তবে সংগঠন তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।
এই বক্তব্যে একদিকে স্বচ্ছতার অঙ্গীকার থাকলেও, অন্যদিকে ঘটনাটির ভেতরের জটিলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। নেতাদের অভিযোগ, পুলিশের পক্ষ থেকে ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের আশ্রয় নিয়ে দায়সারা বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও নির্বাচনকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মূল অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে মোতালেব শিকদারের মা রাবেয়া বেগম এবং জাতীয় শ্রমিক শক্তির মহানগর নেতা মিরাজ উপস্থিত ছিলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মিরাজ বলেন, তানিয়া তন্বী জাতীয় শ্রমিক শক্তির নেত্রী ছিলেন। তবে তিনি কোন পদে ছিলেন—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। এ নিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
একপর্যায়ে সাংবাদিকদের ধারাবাহিক প্রশ্নে মোতালেবের পরিবার ও শ্রমিক শক্তির নেতারা জর্জরিত হয়ে পড়েন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে না পারায় সংবাদ সম্মেলন ঘিরে নতুন করে সন্দেহ ও আলোচনা তৈরি হয়।
এদিকে, দিনভর নানা নাটকীয়তার পর আলোচিত নারী তনিমা তন্বীকে আটক করেছে খুলনা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) রাতে মহানগরীর টুটপাড়া এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি তৈমুর ইসলাম।
এর আগে একই দিন বেলা আনুমানিক ১১টা ৪৫ মিনিটে খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থানাধীন আল আকসা মসজিদ রোডের ১০৯ নম্বর মুক্তা হাউজের নিচতলার একটি কক্ষে তন্বীর বাসায় গুলিবিদ্ধ হন মোতালেব শিকদার। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তোলে।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম, মদের বোতল এবং ব্যবহৃত গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত ঘটনাটির প্রেক্ষাপট নিয়ে তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
গুলিটি কে চালিয়েছে? ঘটনাস্থলে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত? এটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা, নাকি অন্য কোনো বিরোধের ফল? রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব কি এর পেছনে কাজ করেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি এখন আর কেবল একটি অপরাধের বিষয় নয়—এটি পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় আলোচনায়। তন্বী আটক হওয়ার পর এখন সব নজর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে।































