খুলনা নগরীর ৬৭ শতাংশ ভোট কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, আগাম সতর্কতায় পুলিশ

খুন, সন্ত্রাস আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে উদ্বিগ্ন খুলনা মহানগরী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গত ১৬ মাসে নগরীতে সংঘটিত হয়েছে অন্তত ৫১টি হত্যাকাণ্ড। শুধু গত নভেম্বরেই প্রাণ গেছে আটজনের। প্রায়ই ঘটছে গুলি, কুপিয়ে জখমসহ নানা সহিংস ঘটনা।

এসব ঘটনায় জড়িত অধিকাংশ আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ, উদ্ধার হয়নি ব্যবহৃত অস্ত্রও। এমন বাস্তবতায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে।

এই প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছে খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি)। ভোটের প্রায় দুই মাস আগেই মহানগরীর সব ভোটকেন্দ্রের ঝুঁকি যাচাই সম্পন্ন করেছে তারা। পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য—মহানগরীর মোট ৩০৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৭৯টি ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ১২৮টি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ, নগরীর প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকির তালিকায়।

কেএমপি সদরদপ্তর সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে মহানগরীর আট থানার ওসিদের নিজ নিজ এলাকার ভোটকেন্দ্র সরেজমিন পরিদর্শন করে ঝুঁকি মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রের ভৌগোলিক অবস্থান, অতীত সহিংসতার ইতিহাস, সন্ত্রাসী তৎপরতা, যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন জমা দেন ওসিরা।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ৮৪০টি। এর মধ্যে ৩০৯টি মহানগরীর ভেতরে। খুলনা-২ ও খুলনা-৩ আসনের সব কেন্দ্রই নগরীর আওতায়। এছাড়া খুলনা-১ আসনের ১৫টি ও খুলনা-৫ আসনের ২২টি কেন্দ্র নগরসীমার মধ্যে পড়েছে। এসব এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় নগরকেন্দ্রগুলোকেই আগে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) ত ম রোকনুজ্জামান জানান, কোনো ভোটকেন্দ্রে অতীতে গোলযোগ হয়েছিল কি না, ভোট বন্ধ হয়েছিল কি না, কেন্দ্রটি প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কাছে কি না, দুর্গমতা, চারপাশে সীমানা প্রাচীর আছে কি না, অপরাধ করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ও অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।

খুলনা-৩ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সল কাদের বলেন, দুশ্চিন্তার কিছু নেই। নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর হয়—সে জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, ভোটকেন্দ্র ও ভোটের পরিবেশ নিয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক। যেসব পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের কয়েক মাস আগেই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। গোলযোগ হলে কীভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, মহানগরীর ১৪১টি ভোটকেন্দ্রে ইতোমধ্যে নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোতেও ক্যামেরা সংযোজন করা হবে। পাশাপাশি দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের শরীরে ক্যামেরা থাকবে, যাতে যে কোনো ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ভিডিও আকারে পাঠানো যায়।

খুন ও সহিংসতার দীর্ঘ ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা খুলনায় এবার নির্বাচন কতটা নির্বিঘ্ন হবে—সে প্রশ্ন এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। পুলিশের আগাম প্রস্তুতি আশার আলো দেখালেও বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে ভোটের পরিবেশ কতটা নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য হবে।