খুলনার ডুমুরিয়ায়

লোহার রডে পরিষ্কার! বিষাক্ত বোতলজাত পানি, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে হাজারো মানুষ

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা বাজার সংলগ্ন এলাকায় ‘মার্তৃ ফ্রেস ড্রিংকিং ওয়াটার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বোতলজাত পানি উৎপাদনের চিত্র উঠে এসেছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বোতলের ভেতরে লোহার রড বা ধাতব বস্তু প্রবেশ করিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে, আর সম্পূর্ণ খালি হাতেই চলছে পানি বোতলজাত করার কাজ। কর্মীদের কারও হাতে নেই গ্লাভস বা মাস্ক স্বাস্থ্যবিধির কোনো ন্যূনতম মানও মানা হচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বোতলজাত পানি উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে। এতে করে প্রতিদিনই ঝুঁকিপূর্ণ পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।

কারখানাটি ঘুরে দেখা যায়, ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল বছরের পর বছর পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বোতল পরিষ্কারের জন্য কোনো আধুনিক বা স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি নেই। বরং লোহার রড বা অন্যান্য ধাতব বস্তু দিয়ে ভেতরের ময়লা সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পানি পরিশোধনের ক্ষেত্রেও নেই কোনো মানসম্মত প্রযুক্তি বা পরীক্ষার ব্যবস্থা। অপরিষ্কার পরিবেশেই পানি ভরে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনিয়ম সরাসরি পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।

একই বোতল দীর্ঘদিন ব্যবহারের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা মো. বাবলুর রহমান স্বীকার করেন। বিএসটিআই অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের কোনো অনুমোদন নেই। এমনকি লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তার উদাসীনতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বোতলজাত পানির উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর লাইসেন্স গ্রহণ এবং নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বাধ্যতামূলক। এসব নিয়ম লঙ্ঘন করলে তা শুধু আইনগত অপরাধই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদ পানি ব্যবহারের ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যা শিশু ও বয়স্কদের জন্য মারাত্মক হতে পারে।

এ বিষয়ে বিএসটিআই খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (সিএম) মনির হোসেন মুঠোফোনে বলেন, লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিদিনই টিম মাঠে কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রম চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান তদারকি বা অভিযান চোখে পড়েনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকেই কি চলছে এসব অনিয়ম, নাকি অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর?

জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দ্রুত অভিযান চালিয়ে এ ধরনের অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা না হলে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এখন দেখার বিষয়, এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করে।