নওগাঁয় বিচার নয়, যেন ‘বাণিজ্য’: ধর্ষণচেষ্টা ধামাচাপায় ইউপি কার্যালয়ে রাতভর সালি

নওগাঁর মান্দায় একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়কে ঘিরে গড়ে উঠেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ধর্ষণচেষ্টার মতো স্পর্শকাতর ঘটনা মীমাংসার নামে পরিষদের ভেতরেই রাতভর চলেছে বিচারের নামে ‘সাংস্কৃতিক নাটক’, যেখানে বিচারিক ভূমিকা পালন করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্য ও তার অনুসারীরা।

স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ রয়েছে, রোববার (১ মার্চ) বেলা ১০টার দিকে তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের তেপাড়া গ্রামে প্রতিবেশী এক কিশোরীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন হোসেন আলী (৩৫) নামের এক যুবক। কিশোরীর চিৎকারে স্থানীয়রা তাকে আটক করে ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনের জিম্মায় তুলে দেন।

এরপর ইউপি চেয়ারম্যান নিদের্শনায় গ্রাম পুলিশের সহায়তায় তাকে নিয়ে আসা হয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে। তবে অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত হোসেন আলী। তিনি দাবি করেন, ঘটনাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হোসেন আলী বলেন, “ঘটনার সময় আমি বাড়ি ফির ছিলাম। পথে ওই কিশোরীর সঙ্গে আমার ধাক্কা লাগে। কিন্তু আমাদের মধ্যে পারিবারিক পূর্বশত্রুতা থাকায়, অন্য কাউকে প্রভাবিত করার জন্য মেয়েটি ও তার পরিবার আমার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা নাটক সাজিয়েছে এবং হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলা দায়ের করেছে।”

এদিকে, অভিযুক্তের দাবি যা-ই হোক না কেন, ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনের নেতৃত্বে পরিষদ হলরুমে শুরু হয় রুদ্ধদ্বার বৈঠক। সেখানে অভিযুক্তকে দফায় দফায় মারধর করা হয় এবং মীমাংসার শর্ত হিসেবে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনের ভাষ্য, “চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান কামরুলের নির্দেশে অভিযুক্তকে পরিষদে এনে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছিল।”

দায় এড়ানোর চেষ্টা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে,সোমবার দুপুরে দ্বিতীয় দফা সালিস চলাকালীন খবর পেয়ে মান্দা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং হোসেন আলীকে উদ্ধার করে। এ সময় সালিসের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তেঁতুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান কামরুল নিজের দায় এড়িয়ে গিয়ে বিষয়টি সম্পূর্ণ মেম্বারের ব্যক্তিগত কাজ বলে দাবি করেন।

ধর্ষণচেষ্টার মতো অপরাধে সালিস করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কেএম মাসুদ রানা জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে ধর্ষণচেষ্টার মামলা করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে অভিযুক্ত হোসেন আলীকে নওগাঁ কারাগারে পাঠানো হবে। এবং ওসি আরও জানান একটি ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার ইউনিয়ন পরিষদের নেই। অথচ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ মদদে আইনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ‘সালিস বাণিজ্য’ করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা স্থানীয় সরকার কাঠামোর নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বিচার পাওয়ার পরিবর্তে অপরাধীকে অর্থদণ্ড দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া অপরাধকে উসকে দেওয়ার শামিল কি না—এই প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।