স্বাস্থ্যসেবায় ভোগান্তি: নিঃস্ব মানুষের আর্তনাদ কে শুনবে?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এক নীরব দুর্বিপাকের নাম-স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়। দেশে প্রায় ৮০-৯০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো রোগে ভুগে থাকেন। গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক চিকিৎসা কিংবা যোগ্য চিকিৎসকের নাগাল পাওয়া এখনো কঠিন বাস্তবতা। ফলে চিকিৎসার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে শহরমুখী হয় মানুষ। অথচ শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া মানেই যেন নতুন আরেক দুর্ভোগের যাত্রা।

চিকিৎসকের ফি এখন ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা। এ যেন নিত্যদিনের স্বাভাবিক হার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রধানের জন্য এই টাকা জোগাড় করাই দুরূহ, এর পরেই শুরু হয় আরও বড় ব্যয়- বিভিন্ন রোগ নির্ণয় পরীক্ষা।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, চিকিৎসকরা রোগীর প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনা না করে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা লেখে দিচ্ছেন এবং সেই সব টেস্ট করানোর পেছনে লুকিয়ে থাকে কমিশনের অমোঘ প্রবাহ। অর্থাৎ রোগী যত বেশি পরীক্ষা করাবে, ততই সুবিধা পাবেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

এই অনৈতিক বাণিজ্যিক প্রবণতা মানুষের কষ্টকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন অসংখ্য পরিবার। অনেককে বাধ্য হয়ে ঋণ নিতে হচ্ছে, কারও গবাদিপশু বিক্রি করতে হচ্ছে, আবার কারও ছেলে-মেয়ের পড়ার খরচ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও বাস্তবে তা এখন লাভের বাজারে পরিণত হয়েছে। প্রতিকার কী? প্রথমত, চিকিৎসা ফি ও ডায়াগনস্টিক খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতিমালা জরুরি। কোন টেস্ট কেন প্রয়োজন, তা রোগীকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কমিশনভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধে কঠোর নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত চিকিৎসক এবং মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ যদি নিজের এলাকায় উন্নত চিকিৎসা পায়, তবে শহরমুখী চাপ যেমন কমবে, তেমনি খরচের বোঝাও হ্রাস পাবে। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।

প্রয়োজনহীন পরীক্ষা বা চিকিৎসকের অতিরিক্ত পরামর্শে সন্দেহ হলে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া উচিত। রোগীর অধিকার ও স্বাস্থ্যসেবার নৈতিকতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে। চিকিৎসা খাতে অনিয়ম, অতিরিক্ত ফি, কমিশন- এসব শুধু ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতি করে না; এটি পুরো সমাজকে অসুস্থ করে তোলে।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার- বাণিজ্য নয়। এ সত্যটি যদি আমরা ভুলে যাই, তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নয়, দুর্ব্যবস্থাই আমাদের ভবিষ্যৎ হয়ে দাঁড়াবে। এখনই সময়, চিকিৎসা খাতকে মানবিক করার। মানুষের জীবন বাঁচানোর পেশা কখনোই মুনাফার বোঝায় ভারী হতে পারে না। এ কথা যেন সংশ্লিষ্ট সবাই মনে রাখেন।