অযত্নে যশোরের পথে-প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মারক

হাজারো বীর বাঙ্গালীর আত্মত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে লাল-সবুজের এই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। সেই রক্তের দাগ, সেই কান্না, বিজয়ের হাসি—সব একসঙ্গে ধারণ করে যশোর শহরের পথে-প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মারকগুলো।

পাথর, সিমেন্ট আর রঙে গড়া হলেও এসব ভাস্কর্য আসলে জীবন্ত ইতিহাস।কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময়ই তারা পড়ে থাকে উপেক্ষায়। স্বাধীনতার মাস মার্চ আর বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলে তবেই যেন আমাদের চোখে পড়ে স্মৃতির এই স্তম্ভগুলো। বাকি সময়টুকু তারা নীরবে সহ্য করে অবহেলা, ময়লা আর উদাসীনতা।

৩৬ জুলাই:
যশোরের মূল প্রাণকেন্দ্র বকুলতলা মোড়ে ছাত্র জনতার আন্দোলনকে ধারণ করে নির্মিত হয়েছে ৩৬ জুলাই। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় শেখ হাসিনার পতন আন্দোলন স্বরণে রাখতে এটা নির্মাণ করা হয়েছে এই ভাষ্কার্যটি।

বিজয়-৭১:
যশোর শহরের প্রবেশমুখ পালবাড়ী মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘বিজয়-৭১’যশোরের সবচেয়ে বড় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য। এই পথ দিয়েই ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী প্রবেশ করেছিল শত্রুমুক্ত শহরে। খন্দকার বদরুল আলম নান্নুর শিল্পীসত্তায় সেখানে উঠে এসেছে মুক্তিযোদ্ধার দৃপ্ত পদচারণা, উড়ন্ত পতাকা, উল্লসিত কণ্ঠ আর শান্তির পায়রার ডানা। ভাস্কর্যটি যেন বলে—যুদ্ধ শেষ, শুরু হয়েছে স্বাধীনতার সকাল।কিন্তু সেই গৌরবের শরীরেই লেগে থাকে পোস্টারের আঠা, দেয়ালে দেয়ালে লেখা পড়ে রাজনৈতিক স্লোগান।

মনিহার চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা বিজয়স্তম্ভটির গল্প আরও বেদনাদায়ক। স্তম্ভের পাদদেশেই আজ জমে ওঠে ময়লা-আবর্জনা। দুর্গন্ধে ঢেকে যায় বিজয়ের স্মৃতি। যে স্তম্ভ হওয়ার কথা ছিল শ্রদ্ধার, তা যেন পরিণত হয়েছে অবহেলার প্রতীকে।

পুরাতন কসবার ‘জাগ্রত বাঙালি’, এমএম কলেজের ‘চেতনায় চিরঞ্জীব’, মহিলা কলেজের ‘প্রদীপ্ত স্বাধীনতা’—প্রতিটি ভাস্কর্যই একেকটি অধ্যায়। কোথাও পরিবারসহ যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা, কোথাও ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা ইতিহাস, কোথাও রঙের প্রতীকে শোক, সংগ্রাম আর শান্তির ভাষ্য।

স্বাধীনতার উন্মুক্ত মঞ্চ:
টাউন হল ময়দানে অবস্থিত ‘স্বাধীনতার উন্মুক্ত মঞ্চ’ মনে করিয়ে দেয় ১১ ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক জনসভা—যেখানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার ভবিষ্যৎ।

অদম্য ১৯৭১:
যবিপ্রবির ‘অদম্য ১৯৭১’ ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে যুদ্ধশেষে ঘরে ফেরার দৃশ্য। এর প্রতিটি উচ্চতা, প্রতিটি পরিমাপে লুকিয়ে আছে আমাদের জাতীয় দিবসগুলোর প্রতীকী তাৎপর্য—যেন স্বাধীনতা এখানে কেবল ইতিহাস নয়, এক জীবন্ত গণিত।

যশোর শুধু একটি জেলা নয় এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিজয়ের ভূমি। এই ভাস্কর্যগুলো কেবল সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, এগুলো আমাদের আত্মপরিচয়ের আয়না।