খুলনায় শতবর্ষী বিদ্যালয়ে ঝুঁকির মধ্যে পাঠদান, আতঙ্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ১০নং শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান। শত বছরের পুরনো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন এখন যেন শিক্ষার্থীদের জন্য এক নীরব আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের দেয়াল ও ছাদজুড়ে একাধিক বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও প্লাস্টার খসে পড়ছে, আবার কোথাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গভীর চিড়। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনটির অবস্থা দিন দিন আরও নাজুক হয়ে পড়ছে।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই প্রতিদিন প্রায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী ক্লাস করছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা করছে শিক্ষাক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
শুধু ভবনের ঝুঁকিই নয়, বিদ্যালয়ে নেই সুপেয় পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১০ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৃষ্টির সময় বিদ্যালয়ের পুরো মাঠ পানিতে ডুবে যায়, এমনকি ক্লাসরুমেও পানি ঢুকে পড়ে। এ কারণে নিয়মিত অ্যাসেম্বলি বন্ধ রাখতে হয়। পানি দ্রæত না শুকানোর ফলে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকে, যার কারণে তারা মাঠে খেলাধুলাও করতে পারে না।
শিক্ষার্থী নাজিফা বাঁধন রানী চোখে ভয় আর কণ্ঠে আতঙ্ক নিয়ে জানায়, তাদের শ্রেণিকক্ষের ছাদের প্লাস্টার প্রায়ই ভেঙে পড়ে কখনো তা গায়ের ওপরেই এসে লাগে। যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আতঙ্কে থাকে সে ও তার সহপাঠীরা।
সে আরও বলে, বিদ্যালয়ের জানালাগুলো মরিচায় ক্ষয়ে গেছে, অনেক জায়গায় ভেঙেও পড়েছে। ছাদের ধসে পড়া প্লাস্টারে প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায় তাদের বই-খাতা আর জামাকাপড়। প্রতিদিনই ভয় নিয়ে ক্লাস করতে হয় কখন কী ঘটে, সেই আশঙ্কা নিয়েই চলছে তাদের পড়াশোনা।
পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোঃ আব্দুল্লাহ বিন আলমগীর সিদ্দিক জানায়, বিদ্যালয়ে সুপেয় পানির কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। একটি টিউবওয়েল থাকলেও তার পানি ভালো নয়, ফলে শিক্ষার্থীরা বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে। দ্রুত নতুন টিউবওয়েল স্থাপনসহ নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানায় সে।
শিক্ষার্থী স্রিজা রায় আতঙ্কভরা কণ্ঠে জানায়, তাদের কয়েকটি ক্লাসরুমের ছাদে বড় বড় ফাটল ধরেছে। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে প্লাস্টার ধসে পড়ে, যা অনেক সময় তাদের গায়েও এসে লাগে। সে বলে, প্রতিদিন ভয় নিয়ে ক্লাস করতে হয় কখন যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, সেই আশঙ্কা সবসময় কাজ করে। দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের বিপদের শঙ্কা রয়েছে বলেও জানায় সে।
অন্যদিকে শিক্ষকরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সহকারী শিক্ষিকা সোনিয়া ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বৃষ্টির দিনে সমস্যাগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে। শ্রেণিকক্ষের ছাদের বিভিন্ন স্থান থেকে প্লাস্টার খসে পড়ে, যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যালয়ের দেয়ালের প্লাস্টার নষ্ট হয়ে গেছে এবং জানালার গ্রিলেও মরিচা ধরেছে। এমন অনিরাপদ পরিবেশে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
সহকারী শিক্ষক বিপ্লব কুমার সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এত সংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিদিনই তারা আতঙ্কে থাকেন, কখন যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়, সেই শঙ্কা সবসময় কাজ করে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ফাটল দেখা দিয়েছে।
নিচতলার ছাদ একাধিকবার মেরামত করা হলেও তা টেকসই হয়নি। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ভবনটি আর ব্যবহার উপযোগী নেই, দ্রæত সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি বিদ্যমান থাকলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তারা দ্রæত নতুন ভবন নির্মাণ অথবা সংস্কারের দাবি জানান।
শাহপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি ও সমাজসেবক এস এম রবিউল ইসলাম বাবলু বলেন, ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। শুরুতে কাঁচা ঘরে পাঠদান হলেও পরবর্তীতে ভবন নির্মাণ করা হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটির বয়স বেড়ে যাওয়ায় এটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে, যা যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত আধুনিক মানের একটি বহুতল ভবন নির্মাণ জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে এমনটাই আশা করছেন তিনি।
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয় ভবনের অবস্থা ইতোমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এখন প্রশ্ন একটাই দুর্ঘটনার আগেই কি জাগবে কর্তৃপক্ষ, নাকি অপেক্ষা করতে হবে আরও বড় বিপদের?































