ডুমুরিয়ায় পোল্ট্রির দুর্গন্ধে বন্দি এক গ্রাম, মেয়ে দেখতে এসে ফিরে যায় পাত্রপক্ষ!

আমাদের গ্রামের মেয়েদের বিয়েও হচ্ছে না। পাত্রপক্ষ দেখতে এসে দুর্গন্ধে ফিরে যায়। তারা বলে, এমন পরিবেশে বিয়ে করতে চায় না। আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়া রাজবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা নাজমা বেগম।
শান্ত-নিরিবিলি এই গ্রামে এখন প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি পরিবারের বসবাস। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসিক এলাকার মাঝেই গড়ে ওঠা একাধিক ব্রয়লার মুরগির খামারের কারণে পুরো গ্রামজুড়ে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রামটিতে প্রায় ১০টি ব্রয়লার খামারে সাত হাজারেরও বেশি মুরগি পালন করা হচ্ছে। এর মধ্যে সাবেক ইউপি সদস্য সিরাজ উদ্দিন শেখের দুটি খামার ছাড়াও আরিজউদ্দিন শেখের ছেলে আনিসুর রহমান ও সেলিম, মৃত ইসলাম আলীর ছেলে জুয়েল এবং পিয়াসের খামার রয়েছে।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, খামারগুলোর মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না করায় দিন-রাত দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। ঘরের দরজা-জানালা খুলে রাখা যায় না, খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও বাড়ছে বলে দাবি তাদের।
৭০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা খাদিজা বেগম বলেন, এই খামারের দুর্গন্ধে আমরা মারাত্মক কষ্টে আছি। সারাক্ষণ গন্ধের মধ্যে থাকতে থাকতে নানা রোগে ভুগছি, ওষুধ খেতে খেতে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। খামার মালিকদের বিষয়টি বললে তারা বলেন, ‘ভালো না লাগলে অন্য জায়গায় গিয়ে থাকেন। এটা আমাদের জায়গা, আমরা খামার করব।’ আমরা এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন শেখ বলেন, আমার ছয় মাস বয়সী শিশু সন্তান প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। গতকালও তাকে ডাক্তার দেখাতে হয়েছে। এই পরিবেশে শিশুকে সুস্থ রাখা কঠিন। দুর্গন্ধের কারণে আত্মীয়-স্বজনও আমাদের বাড়িতে আসতে চান না। অভিযোগ করলে সমাধানের বদলে আমাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়।
গ্রামবাসীর দাবি, আবাসিক এলাকায় এভাবে বড় আকারে পোল্ট্রি খামার পরিচালনা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। তারা দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবেশসম্মতভাবে খামার পরিচালনা অথবা লোকালয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে খামার মালিক ও সাবেক ইউপি সদস্য সিরাজ উদ্দিন শেখ বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে সোনালি মুরগি পালন দিয়ে খামার শুরু করি। পরে কিছুদিন বন্ধ ছিল। প্রায় দুই বছর আগে আবার ব্রয়লার মুরগি পালন শুরু করেছি। বসতবাড়ির মধ্যে খামার রয়েছে এটা সত্য। তবে এই খামারের আয়ের ওপরই আমাদের পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল।
সরেজমিনে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় সংবাদকর্মীরাও তীব্র দুর্গন্ধ অনুভব করেন। দুর্গন্ধ এতটাই প্রকট ছিল যে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতিরও মিল পাওয়া যায়।
গ্রামবাসীর দাবি, আবাসিক এলাকায় এভাবে খামার পরিচালনা বন্ধ করে পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফুল কবির বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে অথবা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কোনো খামার সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।






























