নওগাঁর বদলগাছীতে টেন্ডার ছাড়াই তিন স্কুলের মালামাল বিক্রির অভিযোগ

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় নিলাম বা টেন্ডার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন না করেই তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো মালামাল বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে মালামাল বিক্রি করে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৫ ফেব্রুয়ারি ছয়টি বিদ্যালয়ের অব্যবহৃত মালামাল খোলা ডাকে নিলামের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১১টায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সভাকক্ষে নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এবং ছয়টি প্রতিষ্ঠানের লোহা/এ্যাংগেল, পুরাতন টিন,ফ্যান, পিয়ানো বিক্রির নিলাম সম্পূর্ণ হয়।
কিন্তু ঔই তিন প্রতিষ্ঠানের লোহা/এ্যাংগেল মোট ২৩৭ কেজি,টিন ১৮৫ কেজি,শীটের বেঞ্চ,পিয়ানো, ফ্যান,পায়া মোট ২১২ কেজি মালামলা বিক্রির কোন নিলাম ছাড়াই বিক্রি অনুমতি দেন অফিস।
অভিযোগ রয়েছে, ওই নিলামে শামীম হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী ছয়টি বিদ্যালয়ের মালামাল কেনার অনুমতি পান। তবে একই দিনে জোলাপাড়া, বালুপাড়া ও ভান্ডারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মালামাল টেন্ডার ছাড়াই তাঁর কাছে বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়।
এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি জোলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে টেবিলের সিটের পায়া (৭০ কেজি), পুরোনো টিন (৬০ কেজি) ও অ্যাঙ্গেল (৪০ কেজি) বিক্রি করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ভান্ডারপুর বিদ্যালয় থেকে লোহা/অ্যাঙ্গেল (৩০ কেজি), ফ্যান (৩৮ কেজি), পিয়ানো (২৪ কেজি) ও জানালা (২৫ কেজি) বিক্রি হয়। ৩ মার্চ বালুপাড়া বিদ্যালয় থেকে লোহা/অ্যাঙ্গেল (৬৭ কেজি), শিটের বেঞ্চ (১৬৭ কেজি) ও টিন (১২৫ কেজি) নেওয়ার সময় স্থানীয়দের বাধার মুখে মালামাল সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, লোহা/অ্যাঙ্গেল ৩৬ টাকা ১০ পয়সা কেজি, পুরোনো টিন ৩০ টাকা, জিআই পাইপ ৩৬ টাকা, শিটের বেঞ্চ ৩০ টাকা ও কাঠের বেঞ্চ ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে—যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক কম।
স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান, সাকিব ও বিপ্লব বলেন, “তিনটি বিদ্যালয়ে প্রায় ২০০টির বেশি স্টিলের বেঞ্চ ছিল। নিলামের আগেই সেগুলোর অনেকাংশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অবৈধভাবে মালামাল বিক্রি করা হয়েছে। আমরা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাই।”
বালুপাড়া বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মাহবুব হোসেন মাহাবুল বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার ছাড়া স্কুলের মালামাল বিক্রি করা যায় না। “আমরা কিছুই জানতাম না। হঠাৎ দেখি মালামাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটি পুরোপুরি অনিয়ম, তারা দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।
ভান্ডারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তহমিনা বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েই মালামাল বিক্রি করা হয়েছে। “টিও স্যার উপস্থিত ছিলেন। আমি কিছু করিনি, যা করার তিনি করেছেন,” দাবি করেন তিনি। তবে বিক্রির লিখিত কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
এ বিষয়ে জোলাপাড়ার প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন,“ ১৫ তারিখের টেন্ডার বিষয়ে জানতে পারি। পরে ১৬ তারিখে আমি রেজুলেশন করি শিক্ষা কর্মকর্তার অফিসে জমা দেই। এর বাহিরে কিছু জানা নেই। বালুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে সংযোগ না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয় নি।
মালামাল ক্রয়কারী ব্যবসায়ী শামীম হোসেন বলেন, “আমি টেন্ডারের মাধ্যমেই মালামাল কিনেছি। এর বেশি কিছু জানি না।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি ছয়টি বিদ্যালয়ের জন্য ওপেন টেন্ডারের নোটিশ দেওয়া হয় এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি নিলাম সম্পন্ন হয়। তবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে স্থানীয়দের জানানো হয়নি। “এটি আমাদের ভুল হয়েছে,” স্বীকার করেন তিনি।
নিলাম কমিটির সভাপতি ও ইউএনও ইসরাত জাহান ছনি বলেন, টেন্ডারের দিন তিনি উপস্থিত ছিলেন না এবং বিষয়টি তাঁর জানা নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নওগাঁ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সানাউল হাবিব বিদ্যুত বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই এবং কোনো অনুলিপিও তিনি পাননি। “সরকারি মালামাল টেন্ডার ছাড়া বিক্রি করা যাবে না। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি ছয়টি বিদ্যালয়ের জন্য উন্মুক্ত নিলাম ডাকা হয়ে থাকে, তাহলে তিনটি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কেন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি? কেন স্থানীয় অভিভাবক ও কমিটিকে জানানো হয়নি? আর বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রির অভিযোগের দায়ই বা নেবে কে?
এ ঘটনায় এলাকায় চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দাবি করেছেন।






























