১২ বছরে ৬০৩ কোটি টাকা বাজেট, তবুও পৌরবাসী পায়নি কাঙ্ক্ষিত সেবা

গত একযুগে ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌরসভায় ৬০৩ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করা হয়। তবে দৃশ্যমান উন্নয়ন আর ঘোষিত বাজেটের মিল খোঁজে পাচ্ছেন না পৌরবাসী। উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত একাধিক প্রকল্পের অনিয়মের কারণে প্রত্যাশিত সুফল আসেনি পৌরবাসীর ভাগ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, উন্নয়নের নামে লুটপাট, অপরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থা, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ড্রেন পরিমাণের নামে খালের নকশা পরিবর্তন, জলাবদ্ধতা, শিশুপার্ক ও বয়স্কদের ওয়াকওয়েবিহীন, পৌর কমিউনিটি সেন্টারশূন্য এ নগরবাসী আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত। বারবার বাজেটে পরে পৌর নগরবাসীর কর ধার্য্য হলেও বাড়েনি সেবাকার্যক্রম।
জানা গেছে, গত ১২ বছরে উন্নয়ন খাতে মোট প্রায় ৬০৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়। তবে বাস্তবে পৌরবাসী এখনো জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত বাজার এবং নাগরিকদের মৌলিক সেবার সঙ্কটেই পড়ে আছেন। বিপুল বাজেটের সাথে বাস্তব উন্নয়নের সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছেন না পৌরবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘ক’ ক্যাটাগরির গৌরীপুর পৌরসভায় পানি সরবরাহ প্রকল্পের অধীনে প্রথম ধাপেব্যয় করা হয় ২ কোটি ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫শ ৯০ টাকা। আর দ্বিতীয় ধাপে ব্যয় হয় ২ কোটি ৮৬ লাখ ৭ হাজার ৯২০ টাকা। এই প্রকল্পে পৌরসভার পাম্পচালক পদে দু’কর্মচারীর বেতন দেওয়া হয়েছে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এই অর্থব্যয়ে শহরবাসীর ভাগ্যে জুটেনি ‘এক ফোঁটা’ পানি।
অন্য দিকে নতুনবাজার সিনেমা হল সড়ক, স্টেশন রোড ও বালুয়াপাড়া এলাকায় প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে খালের ওপর বঙ্কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং সতিষা, নওয়াগাঁও, গুজিখাঁ, নয়াপাড়া, পূর্ব দাপুনিয়া ও সাতুতীসহ অন্তত ১৫-১৬টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
বাজার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেড অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়। পরে একই স্থানে প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন মার্কেট নির্মাণ করা হলেও সেটি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি।
২০১৩ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের সহায়তায় গৌরীপুর পৌরসভার জন্য ৩০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন করা হয়। তবে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্পর্কে অধিকাংশ নাগরিকই অবগত নন। বরং ধানমহাল-পাছেরকান্দা, মধ্যবাজার-কোনাপাড়া, কালীপুর মধ্যম তরফ-কলাবাগান সড়ক, মধ্যবাজার কালীখলা হয়ে উপজেলার সামনের সড়কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বড় বড় গর্তে ভরে গেছে।
বালুয়া নদীর ওপর নির্মিত বেইলি সেতুসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক প্রকল্প এলাকায় তথ্যফলক না থাকায় ব্যয় ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্যও সাধারণ মানুষের অজানাই রয়ে গেছে।
পৌরসভার নয়াপাড়া মহল্লার বাসিন্দা হাবিব উদ্দিন মাসকর জানান, সিনেমা হল মোড় হয়ে পৌরসভার সাবরেজিস্ট্রার অফিসের সামনের রাস্তার পাশে প্যালাসাইটিং নির্মাণ করা হয়। কিন্তু তিন বছরের মাথায় প্যালাসাইটিংটি ভেঙ্গে পুকুরে পড়ে যায় এবং এটি এভাবেই রয়ে গেছে। এতে করে আমার পুকুরে মাছ চাষ করতে অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে।
এ বিষয়ে গৌরীপুর পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমা জানান, আমি গত বছর বাজেটে অনেক কিছু বুঝে উঠিনি। প্রস্তাবিত ও প্রকৃত বাজেটের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ছিল। সে কারণে এ অর্থবছরের ২০২৬-২৭ বাজেট ঘোষণায় প্রকৃত বাজেটর সঙ্গে যেন মিল থাকে, সেইভাবে বাজেট করা হয়েছে।
এদিকে ২৫ জুন এ নগরের শততম বর্ষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৭ কোটি ৮৬ লাখ ৯ হাজার ৩৬৫ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। বাজেটত্তোর সংবাদ সম্মেলন এ তথ্য জানান পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমা। বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং স্থিতি ৩ কোটি ১৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬৫ টাকা।
এছাড়াও ২০২৪-৪৫ অর্থবছরের প্রকৃত বাজেটে আয় ১১ কোটি ৯৯ লাখ ৮১ হাজার ৯৭১ টাকা, ব্যয় ৭ কোটি ৮১ লাখ ৪ হাজার ৬৭৮ টাকা ও স্থিতি ৪ কোটি ১৮ লাখ ৭৭ হাজার ২৯২ টাকা ঘোষণা করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আয় ১৪ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ২৭৮ টাকা, ব্যয় ১১ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৭৯৮ টাকা ও স্থিতি ২ কোটি ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮০ টাকা।
অপরদিকে গৌরীপুর পৌরসভার বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজে ছিল ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৫৮১ টাকা। সংশোধিত বাজেট ধরা হয় ১৩ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯২ টাকা। তবে প্রকৃতপক্ষে এ অর্থবছরে প্রকৃত বাজেট নির্ধারিত হয় ১১ কোটি ৮৩ লাখ ১ হাজার ৯০৭ টাকা। যা প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে প্রকৃত বাজেটের ব্যাপক অমিল। অনুরূপভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট ৫৫ কোটি ৯০ লাখ ৯ হাজার ৭৫৪ টাকা, সংশোধিত বাজেট ৮ কোটি ৯৩ লাখ ১০ হাজার ৯২০ টাকা। প্রকৃত বাজেট ৯ কোটি ৫৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯৪ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৪ কোটি ৯০ লাখ ৩৬ হাজার ৭৪৮ টাকা, প্রকৃত বাজেট ৭ কোটি ৩২ লাখ ৪৫ হাজার ৩১ টাকা।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ২৩ হাজার ৪৭১ টাকা আর প্রকৃত বাজেট ৫ কোটি ১৮ লাখ ৮ হাজার ৬৪০ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫৩ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার ১৮০ টাকা আর প্রকৃত বাজেটে এসে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৭৪ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৫৩ কোটি ৯ লাখ ৬৩ হাজার ১০১ টাকা, তবে প্রকৃত বাজেট হয় ৪ কোটি ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৩৩১ টাকা।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৪ হাজার ২১ টাকা, যার প্রকৃত বাজেট এসে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৭৪ হাজার ৬৬২ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ৪৮ হাজার ৮৯৩ টাকা, প্রকৃত বাজেট হয় ৯ কোটি ২৫ লাখ ৪২ হাজার ২৯৬ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা আর প্রকৃত বাজেটে রূপ নেয় তা ৬ কোটি ৫৬ লাখ ৩৬ হাজার ৫৩৯ টাকায়।
প্রায় প্রতি অর্থবছরেই প্রস্তাবিত ও প্রকৃত বাজেটের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক থেকে যায়।
এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হওয়া অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, বিতর্কিত প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি রাখেন।






























