খুলনায় ভোটকেন্দ্রে বিএনপি নেতার মৃত্যু: ৫ মাস পর কবর থেকে উত্তোলন, তদন্তে নতুন মোড়

খুলনা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে মহানগর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ মহিবুজ্জামান কচি (৬৩)-এর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ মাস পর নতুন মোড় সৃষ্টি হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে আদালতের নির্দেশে তার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে মহানগরীর টুটপাড়া কবরস্থান থেকে মরদেহ উত্তোলনের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জুডিসিয়াল মুন্সিখানা শাখা থেকে জারি করা আদেশ অনুযায়ী, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুস সাকিবের উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
মরদেহ উত্তোলনের সময় কবরস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পরে মরদেহ পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ নির্দেশ দেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কচির মৃত্যুর কারণ নিয়ে শুরু থেকেই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন খুলনা সদর উপজেলার আলিয়া কামিল মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকালে কচির মৃত্যু হয়। তিনি খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ভোটগ্রহণ শুরুর পর কেন্দ্রের ভেতরে কিছু ব্যক্তি ভোটারদের একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছিলেন। এর প্রতিবাদ করলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে কচির ওপর হামলা চালানো হয়।
একপর্যায়ে আলিয়া কামিল মাদ্রাসার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রহিম সরদার তার গলা চেপে ধরে ধাক্কা দিলে তিনি গাছের সঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তবে ঘটনার পর থেকেই মৃত্যুর কারণ নিয়ে দ্বিমত দেখা দেয়। বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করেন, হামলার কারণেই কচির মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
এদিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শরীরে বড় ধরনের দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানা যায়। একই সঙ্গে কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরাও বড় ধরনের সংঘর্ষ বা হাতাহাতির ঘটনা তাদের নজরে না আসার কথা জানিয়েছেন।
ঘটনার কিছুদিন পর নিহতের পরিবার শোকাহত থাকায় খুলনা সদর থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইউসুফ হারুন মজনু খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করেন। দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় দায়ের করা ওই মামলায় আব্দুর রহিম সরদারসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে প্রদান করেন।
মরদেহ উত্তোলনের সময় মামলার বাদী ইউসুফ হারুন মজনু বলেন, নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে গিয়ে তিনি হট্টগোল দেখতে পান এবং তার দাবি, কচির ওপর হামলা হয়েছিল। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্যই আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, মহিবুজ্জামান কচি খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ ছিলেন। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং মামলার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পুনরায় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই ঘটনাকে ঘিরে খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুনঃময়নাতদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্ট সব মহল।






























