যশোরের রাজগঞ্জের ‘সন্দেশ দাদু’ সততা, সংগ্রাম আর মানুষের ভালোবাসার এক অনন্য গল্প

জীবনের প্রতিটি দিনই যেন তার কাছে নতুন এক সংগ্রামের গল্প। বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। মাথায় বয়সের ভার, শরীরে ক্লান্তি, সংসারে দারিদ্র্য আর একের পর এক পারিবারিক দুর্ভোগ। তবুও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। প্রতিদিন সকালে সাইকেলের সঙ্গে একটি হাড়ি বেঁধে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সন্দেশ বিক্রি করেন তিনি।

বলছিলাম যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ অঞ্চলের মোবারকপুর ঘোষপাড়ার বাসিন্দা ফকির ঘোষের কথা। তবে এলাকায় তিনি পরিচিত ‘সন্দেশ দাদু’ নামেই।

রাজগঞ্জ অঞ্চলের এমন কোনো গ্রাম নেই, যেখানে ফকির ঘোষের সাইকেল পৌঁছায়নি। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে সন্দেশ বিক্রি করছেন। এরও আগে কাঁধের বাঁকে করে বিভিন্ন গ্রাম, হাট ও বাজারে ঘোল বিক্রি করতেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, পরিশ্রম আর মানুষের ভালোবাসাকেই তিনি সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে অর্জন করেছেন।

প্রতিদিন সকাল ৮টার মধ্যেই স্থানীয় বাজার থেকে সন্দেশ কিনে হাড়িতে সাজিয়ে সাইকেলে বেঁধে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সারাদিন ঘুরে বেড়ান রাজগঞ্জ অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে। বাজারের তুলনায় কম দামে শিশুদের হাতে সন্দেশ তুলে দেন। কোনো শিশু যদি টাকা কম নিয়েও আসে, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। শিশুদের প্রতি তার এই ভালোবাসাই তাকে সবার প্রিয় করে তুলেছে।

রাজগঞ্জের শিশুদের কাছে তিনি শুধু একজন বিক্রেতা নন, তিনি ‘সন্দেশ দাদু’। দূর থেকে তাকে সাইকেলে আসতে দেখলেই ছুটে আসে শিশুরা। কেউ বলে, “সন্দেশ বুড়ো এসেছে”, আবার কেউ আদর করে ডাকে “সন্দেশ দাদু”। হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তার মুখের সরল হাসি যেন ক্লান্ত জীবনের সব কষ্টকে আড়াল করে রাখে।

ফকির ঘোষের জীবন অবশ্য সুখের নয়। তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। তার তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে প্রায় ভবঘুরের মতো জীবন কাটাচ্ছেন। একমাত্র মেয়ের স্বামীও দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে শয্যাশায়ী।

সংসারের এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও পরিবারের হাল ছাড়েননি তিনি। বয়সের ভারকে উপেক্ষা করেই প্রতিদিন রোজগারের জন্য ছুটে চলেছেন গ্রামের পর গ্রাম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য- ফকির ঘোষ অত্যন্ত সহজ-সরল, সৎ ও নিরহংকার মানুষ। জীবনের এত দীর্ঘ সময়ে তাকে কখনো কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করতে দেখেননি তারা।

সকলের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করেন। তার এই মানবিক গুণের কারণেই রাজগঞ্জ অঞ্চলের প্রায় সব বয়সী মানুষের কাছে তিনি সম্মানিত।

স্থানীয়রা বলেন- ফকির ঘোষ শুধু সন্দেশ বিক্রি করেন না; তিনি মানুষের ভালোবাসাও কুড়িয়ে বেড়ান। তার জীবন নতুন প্রজন্মকে শেখায়-পরিশ্রম, সততা আর আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

আধুনিকতার এই সময়ে, যখন অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তখনও সাইকেলে হাড়ি বেঁধে গ্রামে গ্রামে সন্দেশ বিক্রি করে চলেছেন ফকির ঘোষ। তিনি যেন রাজগঞ্জ অঞ্চলের এক জীবন্ত ঐতিহ্য, এক সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি। তার জীবন প্রমাণ করে, দারিদ্র্য মানুষকে ছোট করতে পারে, কিন্তু সততা, পরিশ্রম ও মানবিকতা মানুষকে সবার হৃদয়ে স্থান করে দেয়।

ফকির ঘোষের জীবন তাই শুধু একজন সন্দেশ বিক্রেতার গল্প নয়; এটি একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ সংগ্রামের ইতিহাস। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি হার মানেননি। প্রতিদিনের মতো আগামীকালও হয়তো সকাল ৮টার মধ্যে সাইকেলে হাড়ি বেঁধে আবার বেরিয়ে পড়বেন রাজগঞ্জের গ্রামের পথে-শিশুদের হাতে সন্দেশ তুলে দিতে, আর মানুষকে মনে করিয়ে দিতে যে সংগ্রামই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।