রাঙামাটিতে বন্যায় অবকাঠামো ও মৎস্য খাতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় সৃষ্ট বন্যায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে। জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার রাঙ্গামাটি জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আনুমানিক মোট সংখ্যা ১ লক্ষ ৮ হাজার ৭,১৭ জনে পৌঁছেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে জীবন বাঁচাতে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জেলা প্রশাসনের খোলা আশ্রয়কেন্দ্রে ৬,১৫৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
রাঙ্গামাটিতে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলা। এর মধ্যে বাঘাইছড়ি উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন, যথা বাঘাইছড়ি ইউনিয়ন, মরিশ্যা ইউনিয়ন ও সাজেক ইউনিয়ন এবং বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভূমিধস ও বন্যার কারণে এসব এলাকার বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। একই সাথে, ভয়াবহ ভূমিধসের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জেলা সদর দপ্তরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, জেলা প্রশাসন বন্যা-আক্রান্ত প্রান্তিক ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ৩২,৫৪৭ জনকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি সহায়তা হিসেবে প্রশাসন এখন পর্যন্ত নগদ ৩৫ লক্ষ টাকা, ২৯৫ মেট্রিক টন চাল এবং মুড়ি, চিড়া, গুড়, মোমবাতি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ ২,৩১৪ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করেছে।
বন্যা জেলার প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলোর পাশাপাশি বাড়িঘরেরও ব্যাপক ক্ষতি করেছে। জেলা প্রশাসনের মতে, রাঙ্গামাটিতে ৩,৬৭৫ হেক্টর আবাদি জমি বন্যার পানিতে সম্পূর্ণভাবে তলিয়ে গেছে, সরকার বর্তমানে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করছে।
অন্যদিকে, বন্যার পানিতে অনেক পুকুর ও মৎস্য প্রকল্প ভেসে গেছে। মৎস্য খাতে কোনো কাঠামোগত ক্ষতি না হলেও, ভেসে যাওয়া মাছের কারণে মোট ৩ কোটি ১৪ লাখ ৩২ হাজার টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও, পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ১৫৬.৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, সেগুলোকে চলাচলের উপযোগী করার জন্য জরুরি মেরামতের প্রয়োজনীয় বাজেটও সরকার পর্যালোচনা করছে।
জেলা প্রশাসন পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী ও সময়োপযোগী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জানানো হয়েছে যে, পাহাড়ের পানি কমার সাথে সাথেই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এই পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফি বলেন, “ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের জন্য আমরা একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এর অংশ হিসেবে, বন্যা কবলিত এলাকার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে অত্যাধুনিক বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সাথে পাহাড়ি বন্যায় ও দুর্গম পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ে দুর্গত মানুষের কাছে উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ পৌঁছাতে বন্যা ঝুঁকিপ্রবণ উপজেলাগুলোর জন্য জরুরি ফাইবার বোট বা স্পিডবোট ক্রয় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি সঠিক তালিকা প্রণয়ন করে তাদের দ্রুত বাড়িঘর মেরামতের জন্য ঢেউটিন ও নগদ অর্থ মঞ্জুর করা হবে।’ তৈরি করছি এবং তাদের ঘরবাড়ি দ্রুত মেরামতের জন্য টিন ও নগদ অর্থ প্রদান করছি।”






























